দিনাজপুর সংবাদাতা ‘পাঠ্যপুস্তকে প্রগতিশীল লেখকের লেখা বাদ দেয়া ও সাম্প্রদায়িকীকরণ প্রতিরোধ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠক ২৯ জুলাই সন্ধ্যায় বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী দিনাজপুর জেলা সংসদ-এর আয়োজনে দিনাজপুর শিল্প ও বণিক সমিতির সেমিনার কক্ষে গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

গোলটেবিল বৈঠকে বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, ছাত্র, যুব, নারী, পেশাজীবী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিবৃন্দ অংশগ্রহন করেন। উদীচী দিনাজপুর জেলা সংসদের সভাপতি রেজাউর রহমান রেজুর সভাপতিত্বে গোলটেবিল বৈঠকের শুরুতে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন জেলা সংসদের সাধারণ সম্পাদক সত্য ঘোষ। ধারণাপত্র পাঠ করেন উদীচী জেলা সংসদের সহ-সভাপতি হাবিবুল ইসলাম বাবুল। নির্ধারিত আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন আমাদের থিয়েটারের সভাপতি গবেষক, প্রাবন্ধিক ড. মাসুদুল হক।

মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রিয় কমিটির সদস্য আলতাফ হোসাইন, জাসদের জেলা সাধারণ সম্পাদক সহিদুল ইসলাম, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক সুলতান কামাল উদ্দিন বাচ্চু, রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলিন পরিষদের সভাপতি রবিউল আউয়াল খোকা, মহিলা পরিষদের সভাপতি কানিজ রহমান, জেলা খেলাঘরের সাধারণ সস্পাদক নুরুল মতিন সৈকত, ছাত্র ফ্রন্টের নেতা মনিরুজ্জামান মনির, প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ দুলাল, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির আহবায়ক বদিউজ্জামান বাদল, এ্যাডভোকেট মেহেরুল ইসলাম, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. আহাদ আলী, উদীচীর প্রাক্তন সভাপতি আসাদুল্লাহ সরকার আসাদ ও কবি জলিল আহমেদ প্রমুখ। অনুষ্ঠানে পাঠ্যক্রম থেকে বাদ দেয়া কবিতা আবৃত্তি করেন প্রভাষক শেখ সগির আহমেদ, শিক্ষক সিরাজাম মনিরা এবং প্রভাষক রাজিয়া সুলতানা পলি।

বক্তারা বলেন, এ বছর প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকে যে পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছে তা স্বাভাবিক নিয়ম মেনে হয়নি। শিক্ষার্থীদের হাতে পৌছে দেয়া পাঠ্য বইগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বিগত কয়েক বছর ধরেই। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃক অনুমোদিত পাঠ্যপুস্তকগুলোতে যে ভুল ও তথ্য বিকৃতির ছড়াছড়ি, একটু লক্ষ্য করলেই বোঝা যায় এটি তিন ধরনের।

এক, বানান ও তথ্যগত বিকৃতি; দুই, বাক্য গঠনে ভুল; তিন, মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তির অনুপ্রবেশ ঘটানো। এক ও দুই নম্বর ভুলগুলো সঠিক পরিকল্পনা এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে হচ্ছে। কিন্তু তৃতীয় ভুলটি পরিকল্পিত এবং যারা করছেন তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই একটি সাম্প্রদায়িক জাতিরাষ্ট্র গঠনের জন্য এই কাজটি করে চলেছেন। এনসিটিবির অনুমোদনের বাইরে মাদ্রাসা এবং কিন্ডার গার্টেনে যা পড়ানো হয় তা আরো ভয়াবহ। একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, ‘গ’ বর্ণ পরিচয়ে লেখা হয়েছে ‘গান শোনা ভাল নয়’।

বক্তারা আরো বলেন, পাঠ্যপুস্তক সাম্প্রদায়িকীকরণ, পহেলা বৈশাখের উপর আক্রমণ-অপপ্রচার, ভাষ্কর্য অপসারণ, কওমি মাদ্রাসার মাষ্টার্স সমমান ডিগ্রী প্রদানসহ উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর কাছে আত্মসমর্পণ ও সাম্প্রদায়িক নীতি প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সকল প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন, ছাত্র সংগঠন, নারী সংগঠনসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ ব্যক্তি, সংগঠন ও দলকে ঐক্যবদ্ধভাবে গণআন্দোলন করতে হবে।

গোলটেবিল বৈঠক থেকে দাবী করা হয় সম্প্রদায়িক শক্তিকে খুশি করার লক্ষ্যে পাঠ্যপুস্তকে যে পরিবর্তন করা হয়েছে তা অবিলম্বে সরকারকে সংশোধন করতে হবে। পশ্চাদপদ ও মৌলবাদী সম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে আপোষ সরকারের জন্য মঙ্গলজনক নয় বরং এই নীতি প্রগতির পথ রুদ্ধ করবে। একদিকে সরকারের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, বিভিন্ন নামের মৌলবাদী জঙ্গি সংগঠন নির্মূল করার ঘোষনা পরস্পর বিরোধী বলেই বক্তারা মনে করে।

পরে উদীচী দলীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে গোলটেবিল বৈঠক শেষ করা হয়।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য