আজিজুল ইসলাম বারী,লালমনিরহাট থেকে : খা খা খা বক্ষিলারে কাঁচা ধইরা খা, খেলা দেইখ্যা যে পয়সা না দেয় ,তারে ধইরা খা !সাপের ঝাঁপি মাথায় নিয়ে পাড়াময় ঘুরে বেড়ানো বেদে নারীদের এমন সুরেলা কণ্ঠ আগের দিনে শোনেনি , এমন মানুষ পাওয়া ছিল ভার।

বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের লোকায়ত সংস্কৃতির অনেকটা জুড়ে আছে এই বেদে সমাজ। গল্প , কবিতা , উপন্যাস থেকে শুরু করে সেলুলয়েডের পর্দায় কত রূপে বেদে- বেদেনী উপস্থিত হয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই।পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের বেদের মেয়ের আগে এবং পরে অসংখ্য কবি সাহিত্যিকের কলমে নানা আখ্যান উঠে এসেছে বেদেদের ঘিরে। আজ এ ঘাটে, কাল অন্য ঘাটে। আজ এখানে, কাল ওখানে। যাযাবরদের মতো জীবনধারার বেদেদের রয়েছে বৈচিত্র্যপূর্ণ সমাজ ও সংস্কৃতি। রয়েছে নিজস্ব জীবনবোধ ও স্বকীয়তা।গ্রামে গ্রামে ঘুরে সাপ খেলা, বানর খেলা, তাবিজ বিক্রি করেই চলে বেদে সম্প্রদায়ের মানুষের জীবন।তাদের নেই কোনো স্থায়ী ঠিকানা। কোনো কোনো জায়গায় ১০-১৫দিনের বেশি বসবাস করে না তারা।

কয়েকদিন ধরে,লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা,কালীগঞ্জ ও পাটগ্রাম উপজেলায় অস্থায়ীভাবে কয়েকটি বেদে পরিবার বসবাস করছে। পরিবারগুলোতে ৩০ থেকে ৩৫ জন মানুষ রয়েছে।বেদে সম্প্রদায়ের মানুষের জীবন সংগ্রামের নানাদিক নিয়ে কথা হয় তাদের সাথে।চৌদ্দপুরুষ এই পেশার সাথে জড়িত বলে জানান, ৫০ বছর বয়সী লালচাঁন সর্দার।তার বাড়ি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায়। লালচাঁন সর্দার বলেন, “ছোটবেলায় যখন থেকে বুঝতে শিখেছি তখন থেকেই সাপ নিয়ে খেলা শুরু, সেই সাপের খেলা এখনও চলছে। সাপের খেলা দেখে মানুষ আনন্দ পায় আর বিনিময়ে টাকা দেয়। আর এই টাকাতেই চলে সংসার।”এ যুগেও সাপ খেলা দেখার প্রতি মানুষের আগ্রহ আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সাপ খেলার জনপ্রিয়তা এখনও কমেনি। ছোট থেকে বুড়ো সব বয়সের মানুষ সাপ খেলা দেখতে ভালোবাসে।” সাপ খেলা দেখার পাশাপাশি অন্যের বাড়ি ঘরে বাস করা সাপ বের করে দেন। এর বিনিময়েও টাকা পান।

আরো কথা হয় বেদেনি বুলবুলি খাতুনের সাথে। তিনি জানান, জন্মের পর থেকে এই পেশার সাথে জড়িত। তারা নারীরা দল বেঁধে গ্রামে গ্রামে বানর খেলা ও সাপ খেলা দেখান। পাশাপাশি তাবিজ ও গাছ-গাছালির ঔষুধও বিক্রি করেন। সাধারণ মানুষ অনেক সময় তাদের নিয়ে খারাপ মন্তব্য করে জানিয়ে বলেন, “আমরা পেটের খাবারের জন্য সাপ খেলা দেখাই, গ্রামে গ্রামে ঘুরি। অনাহারে থাকলে তো কেউ খোঁজও নিতে আসে না” নারী হয়ে এই সমাজে অনেকটা সংগ্রাম করেই পথ চলতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সাপের মধ্যে গোখরা, কালো গোখরা, পঙ্খীরাজ, শীষ নাগ, কাল নাগ-নাগিনী, অজগরসহ ১৫-২০ প্রকারের সাপ আছে তাদের কাছে। এছাড়াও মৌসুমী, সাধু, কৃষ্ণ নামে তিনটি বানর রয়েছে।মোহাম্মদ আলাল সর্দার নামে আরেকজন জানান, সাপের খেলা দেখিয়ে প্রতিদিন ৫০০-৭০০ টাকা আয় হয়। এই টাকা দিয়ে সাপ ও বানরের খাবার কিনে নিজেরদের খাবারও কিনতে হয়। ছয় মাস দেশের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে ঘুরে সাপের খেলা দেখান তারা।আর বাকি ছয় মাস নিজের জেলাতে ছোটখাটো ব্যবসা করেই বছর পার করেন। এভাবেই চলছে বেদে সম্প্রদায় মানুষের জীবন সংগ্রাম।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য