প্রায় বারো মাসই পঞ্চগড়ের প্রধান নদী করতোয়ায় হাঁটুজল থাকে। এমনকি বর্ষাকালেও শুকনো করতোয়ায় বালুচর দেখা যায়। সম্প্রতি দেশের অন্যত্র বন্যা হলেও দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের নদীগুলো শুকনোই রয়ে গেছে। আষাঢ় শ্রাবণেও জেলার করতোয়াসহ ছোট বড় নদীগুলোর দুকূলে জলের স্পর্শ লাগে নি। নদীর বুকে মাঝে মাঝে জেগে উঠেছে বালুচর। গত এক দশকে করতোয়া নদীতে উল্লেখযোগ্য হারে পানি হ্রাস পেয়ে যাচ্ছে। জেলার উপর দিয়ে বয়ে চলা নদীগুলোর উজানে ভারতের একতরফা বাধা নির্মাণ আর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই বর্ষাকালেও করতোয়ায় পানি নেই বলে জানিয়েছেন পরিবেশবিদরা।

একটা সময় ছিল যখন এলাকার মানুষের কাছে করতোয়া প্রবল খরস্রোতা নদী হিসেবে পরিচিত ছিল। মহাভারতে এই নদীকে প্রবল খরস্রোতা ও পবিত্র নদী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পঞ্চগড় জেলার গোড়াপত্তন হয়েছিল এই করতোয়া নদীকে ঘিরেই। বর্ষার আকাশে মেঘের গুড়ুম গুড়ুম শব্দ আর পানির তোড়ে করতোয়ার ভাঙনের শব্দে ঘুম ভাঙতো নদীর তীরবর্তী মানুষের। বণিকদের বড় বড় জাহাজ চলতো এই নদী দিয়ে। কিন্তু কালের বির্বতনে আর উজানে বাঁধ নির্মাণের কারণে করতোয়া নদী আজ প্রাণ হারাতে বসেছে। স্রোতসিনী করতোয়া এখন মরাখালে পরিণত হয়েছে। এখন বর্ষাকালেও করতোয়া আগের মতো আর দুকূল প্লাবিত করে বয়ে চলে না। নেই আগের মতো জৌলুস। হাঁটু পানির নিচে চিকচিক করা বালি দেখা যায়।

শুধু করতোয়া নয় পঞ্চগড় জেলার উপর দিয়ে বয়ে চলা চাওয়াই, মহানন্দা, ডাহুক, বেরং, টাঙ্গন, তালমা, পাঙ্গা, পাম, ভেরসা, আত্রাই,গোবরা, তীরনই, রণচন্ডী, ছেতনাই, পেটকি, ঘোরামারা, মরা তিস্তা, নাগর, খড়খড়িয়া, সুই, ছোট যমুনা, করতোয়া, পাথরাজ, ভূল্লি, কুড়ুম সহ ছোট বড় ৩৩ টি নদীর অবস্থা একই রকম। জেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া এসব নদীগুলোর উৎপত্তিস্থল ভারতের হিমালয় ও সিকিমের পার্বত্য অঞ্চল থেকে। সেখান থেকে উৎপত্তি হয়ে সীমান্ত পেরিয়ে পঞ্চগড়ের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। কিন্তু অভিন্ন এই নদীগুলোর উজানে ভারত একাধিক বাঁধ নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহার আর নাব্যতা হারিয়ে নদীগুলোর এই নাজুক অবস্থা বলে জানা যায। নদীগুলোর অধিকাংশই মানচিত্র থেকে বিদায় নেয়ার পথে। নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়েছে কৃষি, মাছ, জলজ উদ্ভিদসহ প্রাণীকূলেও। হুমকিতে পড়েছে নদী কেন্দ্রিক কৃষকদের সেচ ব্যবস্থা। জেলায় দেখা দিয়েছে দেশী মাছের সংকট। জীবিকা নির্বাহ নিয়ে সঙ্কটে পড়েছেন জেলেরাও।

দেবীগঞ্জ উপজেলার করতোয়া পাড়ের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব আব্দুল গফুর জানান, জীবনের অধিকাংশ সময় পাড় করেছি করতোয়া নদীর সাথে। ছোট বেলার সোনালী দিনগুলো মনে পড়লে চোখে পানি এসে যায়। করতোয়া নদীকে দেখলে বড় কষ্ট হয়। পানি শুকিয়ে করতোয়া যেন ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছে। পঞ্চগড় সদর উপজেলার আমতলা এলাকার করতোয়া পাড়ের বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম জানান, আষাঢ় মাস শেষ হয়ে শ্রাবণ চলছে কিন্তু করতোয়ায় পানি নাই । এখন বর্ষাকালেও নদী হেঁটে পাড় হওয়া যায়। সদর উপজেলার কাজিপাড়া এলাকার জেলে মাসুম আলী জানান, আগের মতো আর মাছ নাই। সারাদিন মাছ ধরলে আধা কেজির বেশি পাওয়া যায়না। তাই জেলে পেশা ছেড়ে দিয়ে অনেকেই অন্য পেশা গ্রহণ করছে।

পঞ্চগড় পরিবেশ পরিষদের সভাপতি তৌহিদুল বারী বাবু বলেন, জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব আর ভারত থেকে আসা অভিন্ন নদীগুলোতে একতরফাভাবে বাঁধ নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহার করায় পঞ্চগড়ের উপর দিয়ে প্রবাহিত ছোট-বড় নদীগুলোর পানি প্রবাহ কমে গেছে। এবার বৃষ্টিপাত না হওয়ায় নদীর পানি আরো কমে গেছে। এছাড়া নদীগুলো নাব্যতা হারালেও কোন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। পঞ্চগড় পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর জানান, ইতোমধ্যে বিলুপ্ত ছিটমহল ঘেঁষা করতোয়া নদীর ৫ কিলোমিটার খননের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার । এবছর আরও ৭৭ কিলোমিটার খননের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে । একইভাবে অন্যান্য নদীগুলো খননের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হবে বলেও তিনি জানান।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য