মাসুদ রানা পলক, ঠাকুরগাঁও থেকেঃ মামুন অর রশিদ (মামুন)। আমাদের খুব কাছের প্রিয় সহকর্মী ও বড়ভাই। বর্তমানে দেশের সুনামধন্য টেলিভিশন চ্যানেল টুয়েন্টিফোরে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। চ্যানেল টুয়েন্টিফোরের যাত্রা থেকেই আমি কাজ করে আসছিলাম। প্রায় ২ বছর নিয়মিত কাজ করেছি।
খুবই মনে পড়ছে সেদিনের কথা, যেদিন চ্যানেল টুয়েন্টিফোর ঠাকুরগাঁও থেকে আমরা কয়েকজন ইন্টারভিউ দিতে গেলাম। তাদের মধ্যে মামুন ভাইও একজন আবেদনকারী প্রার্থী ছিলেন। দীর্ঘদিন কাজ করার সুবাদে কর্তৃপক্ষ আমার উপর সন্তুষ্টি ছিলেন। সকলে ইন্টারভিউ দিয়ে বেড় হয়ে চ্যানেল টুয়েন্টিফোর অফিসের সামনে চা খেতে খেতে আলোচনা করছিলাম। কে যে ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি হয় চ্যানেল টুয়েন্টিফোরের।

কিছুক্ষন পর চ্যানেল কর্তৃপক্ষ বললেন আপনারা সকলে বাড়ি ফিরে যান। অফিস থেকে আপনাদের জানিয়ে দেওয়া হবে। তারপরে আমরা ঠাকুরগাঁওয়ের পথে অনেকেই রওনা হলাম।

কয়েকদিন পরে চ্যানেল টুয়েন্টিফোর থেকে একজন কল দিয়ে বললেন তানু ভাই সরি, আপনার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ দীর্ঘ দুই বছর আমাদের নিউজ দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য। আপনার বয়স এখন অনেক কম, নতুন অনেক চ্যানেল আসছে আপনার কাজের মাধ্যমেই আপনি ঠিকই একটি ভাল চ্যানেলে সুযোগ পাবেন।

উনার কথা শুনে টিভিতে দীর্ঘদিনের কাজ করার ইচ্ছেটা কেন জানি ভেঙ্গে গেল। তবুও হতাশ হলাম না। তারপরে জানতে চাইলাম ঠাকুরগাঁওয়ে নতুন প্রতিনিধি কে ভাই, উত্তরে বললেন আপনাদের বড় ভাই মামুন অর রশিদ। মামুন ভাই নিয়োগ পেয়েছেন শুনে ভাল লাগলো।

কারণ দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতা করে আসছিলেন মামুন ভাই কিন্তু কোন ভাল মিডিয়া হাউজে কাজ করার সুযোগ পাননি তিনি এর আগে।

তারপর দু’দিন পরে মামুন ভাই আমার অফিসে আসেন। হঠাৎ বুকে জড়িয়ে ধরে বললো তানু চ্যানেল টুয়েন্টিফোর পাওয়ার প্রাপ্য তোমার ছিল। কারণ তুমি দীর্ঘদিন পরিশ্রম করেছো নিয়োগের জন্য। কর্তৃপক্ষ তোমার বয়স কম হওয়ার কারণে আমাকে নিয়োগ দিয়েছে। মনে কিছু করিও না ছোট ভাই, আমি বিশ্বাস করি তুমি একদিন অনেক বড় সাংবাদিক হবা ও ভাল চ্যানেলে কাজ করার সুযোগ হবে তোমার। সে দিনে আমার ও কাজের প্রতি মামুন ভাইয়ের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করায় মুগ্ধ হয়ে ছিলাম। নিয়োগ না পাওয়ার কথাটি ভুলে গিয়েছিলাম সেদিনই।

কেন জানি সেদিন থেকেই মামুন ভাই আমার খুব কাছের সহকর্মী ও বড় ভাই হয়ে যায়। কোন ঘটনার জানার জন্য প্রতিদিন ফোন করে খবর নিতেন তিনি। সময়ের সাথে সাথে সম্পর্কটা গভীর হতে থাকে মামুন ভাইয়ের সাথে ।

এর মাঝেই আমি একটি ভাল চ্যানেলে কাজ করার সুযোগ পেয়ে যায়। মামুন ভাই খবরটি শুনে অনেক খুশি হয়েছিল।

যখন ঠাকুরগাঁও প্রেসক্লাবে মামুন ভাইসহ অন্যান্যরা সদস্য হওয়ার সুযোগ পেলাম। পরবর্তীতে প্রেসক্লাবের নির্বাচনে আমিই উনাকে সহ-সভাপতি পদে প্রার্থী হওয়ার উৎসাহ প্রদান করি। কিন্তু তেমন উৎসাহ উনার ছিল না। আমার উপর বিশ্বাস রেখেই উনি সহ-সভাপতি পদে প্রার্থী হোন ও পরে নির্বাচিত হয়। মামুন ভাই সব সময় বলতেন তানু আগামীতে তোমাকেই প্রেসক্লাবের হাল ধরতে হবে। আমি বললতাম মামুন ভাই আপনারা তো আছেন, আমি এখনো অনেক ছোট সময় আসলে পরবর্তীতে দেখা যাবে।

কিছুদিন আগের মামুন ভাইয়ের সাথে দেখা। তার শরীরের অবস্থা দেখে নিজেকে খুব খারাপ লাগলো। বললাম ভাই শুকিয়ে যাচ্ছেন যে, উনি উত্তরে বললো ঠিকই তো আছি। আমি বললাম ভাই ডাক্তার দেখান তো আগে, কোন সমস্যা মনে হয় আপনার।

তারপরে কিছুদিন পর শুনি মামুন ভাই অসুস্থ। ডাক্তার তাকে ঢাকায় পরীক্ষা নিরীক্ষা করার জন্য রেফার্ড করেছেন। পরে উনি ঢাকায় একটি হাসপাতালে ভর্তি হোন। পরীক্ষা নিরীক্ষা পর দেখা যায় মামুন ভাইয়ের শীররে লিভার ক্যান্সার নামক এক মরনব্যাধি রোগ ধরা পড়েছে। শুনে হতাশ হলাম আমিও অন্যান্য সহকর্মীরা।

ঢাকায় চিকিৎসারত থাকা অবস্থায় মামুন ভাইয়ের সাথে ফোনে কথা বলার সময় বললো তানু তোমার কথা মত দুই মাস আগে যদি ডাক্তার দেখাতাম তাহলে এমনটি মনে হয় না রে ভাই। তার কথা গুলো শুনে খুব কষ্ট হচ্ছিলো।

কয়েকদিন আগে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে তাকে। আজ কেন জানি খুব মনে পড়ছিল মামুন ভাইয়ের কথা। মামুন ভাইয়ের সাথে ভারতে গিয়েছেন আমার আর এক প্রিয় বড়ভাই মিঠু ভাই। ফেসবুকে ভিডিও কলিং এ কথা হচ্ছিলো তার সাথে মামুন ভাইয়ের খোঁজ খবর জানার জন্য।

মিঠু ভাইয়ের কাছে জানতে চাইলাম মামুন ভাই কেমন আছেন। উনি বললেন, দীর্ঘ পথ জার্নি করে আসার পর ও প্রচন্ড গরমেন কারনে একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। দূর্বল হওয়ার কারণে কথা বলতে পারছেন না। কেন জানি দেখার ইচ্ছে হলো মামুন ভাইকে একটু। মিঠু ভাই বললো ঘুমিয়েছেন উনি। তবু বললাম মোবাইল ফোনটি উনার দিকে নিয়ে যান একবার দেখি, তারপরে মিঠু ভাই ফোনটি উনার সামনে নিয়ে গেলেন। এ সময় আমার কথা গুলো যায় মামুন ভাইয়ের কানে, উনি হাত ইশারা করে আমাকে কি জানি বলছিলেন। চোখে মুখে অন্ধকারের ছাপ, শরীরের দিকে তাকা মাত্র আমার চোখে পানি এসে গেল ।

অনুমান করছিলাম, মামুন ভাই বলছিল তানু আমি ভাল নেই রে ভাই, আমি তোমাদের কাছে ফিরে যেতে চাই। উনার চোখ গুলো টলমল করছিল তখন। মামুন ভাইয়ের শরীরের অবস্থার যে অবনতি হয়ে তা খুব করুন।

মামুন ভাই কি জানি আমাকে বলতে চাচ্ছিলো কিন্তু কথা বলতে পারছিলো না দূর্বল হওয়ার কারনে। আমি এইটুকুই শুধু বললাম মামুন ভাই আমাদের মাঝে সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখেন, আপনার জন্য সবাই দোয়া করছেন। তার পরে ফোনটি কেটে লেখতে বসলাম, আর পূর্বের কিছু স্মৃতির কথা মনে করে একটু চোখের পানি ঝড়ালাম মাত্র।

সুস্থ হয়ে মামুন ভাই পরিবার ও আমাদের মাঝে ফিরে আসুন। মামুন ভাই আপনার পরিবারের সদস্যরা ও সহকর্মীরা অপেক্ষা করছেন সুস্থ হয়ে ফিরে আসার জন্য। আপনার সুস্থ হয়ে ফিরে আসার প্রত্যাশায় আমি ও আপনার সকল সহকর্মীরা।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য