আজিজুল ইসলাম বারী,লালমনিরহাট প্রতিনিধি: বিদ্যুৎ বিভাগের গাফিলতি আর বিভিন্ন কর্তাব্যক্তির অবহেলায় যেভাবে একের পর এক তরতাজা প্রাণ হাড়িয়ে যাচ্ছে! তাতে তো ইতিমত ভাবনায় পড়ে গেছে লালমনিরহাট জেলাবাসি। গত তিন মাসের ব্যবধানে শুধুমাত্র বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন মেরামত করতে গিয়ে বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হয়ে অকাতরে চলে গেছে তরতাজা ৬টি প্রাণ। এর বাহিরে তো আরও আছে। আর এরা সবাই বিদ্যুৎ অফিসের বাহিরে সাধারণ ইলেকট্রেশিয়ান। একটু ইনকাম করে দুবেলা ভালো খাবার আশায় এরা সবসময় বিদ্যুৎ অফিসের কর্তাদের কথায় জীবন দিতে প্রস্তুত থাকেন।

আর তাদের এই সরলতাকে কাজে লাগিয়ে নিরাপদে থাকে বিদ্যুৎ অফিসের কর্মচারী ও কর্মকর্তাগন। ভালো চাকরি পাবার আশায়! লেখাপড়ার পাশাপাশি বিদ্যুতের কাজ করতেন রুবেল। অনেক দিন কাজ করে ইতিমধ্যে দেড় লাখ টাকা জমিয়েছিলেন সে। আর ছেলের চাকরির জন্য রুবেলের বাবা সেই টাকা দিয়ে রেখেছেন এক ব্যক্তির কাছে। কিন্তু রুবেল গত শুক্রবার রাতে মারা গেছেন বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন মেরামত করতে গিয়ে।

এদিকে বিএ দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র মোরসালিনকে হারিয়ে তাঁর মা-বাবা পাগলপ্রায়। সেই শোক যেন ছড়িয়েছে পুরো গ্রামে।শনিবার দুপুরে লাশ দাফনের আগে রুবেলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শুধুই কান্নার রোল। পরিবার-স্বজন সবাই কাঁদছে। মা রোজিনা বেগম মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিকেলে (শুক্রবার) ঠিকাদার ফোন করে ছেলেকে ডাকছিল। সে যাবে না বলে আমাকে জানিয়েছিল। বারবার ফোনের কারণে যেতে বাধ্য হয়। তবে যাওয়ার আগে বলেছিল, অনেক দিন থেকে খায় না। তাই রাতে হাঁসের মাংস খাবে।

আমিও রান্না করেছিলাম। কিন্তু রাতে সে ফিরল লাশ হয়ে। আর কিছু বলতে পারেন না তিনি। ডুকরে কেঁদে চেতনা হারিয়ে ফেলেন। রুবেলের প্রতিবেশী মোরসালিনের বাড়িতেও প্রায় একই দৃশ্য। সবাই কেঁদে চলেছে যে যার মতো।বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের কাজ করতে গিয়ে ঠিকাদার বা বিদ্যুৎ বিভাগের গাফিলতিতে শুধু রুবেল-মোরসালিনই যে মারা গেছেন, তা নয়। উত্তরের জেলা লালমনিরহাটে এর আগেও ঘটেছে এমন ঘটনা। বিদ্যুৎকর্মীর পাশাপাশি মরছে সাধারণ মানুষও।আর এসবের পেছনে দায়ী করা হচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগের গাফিলতিকে। এর ওপর স্বজন হারানো পরিবারগুলো পাচ্ছে না ক্ষতিপূরণ।

গত এপ্রিলে হাতীবান্ধা উপজেলায় ঘটেছে আরেকটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। সেখানে সঞ্চালন লাইনের কাজ করতে গিয়ে একসঙ্গে মারা যান চারজন। তাঁরা হলেন ভেলাগুড়ি গ্রামের খোরশেদ, ফেরদৌস হোসেন, উকিল মিয়া এবং পাশের মধ্য কাদমা গ্রামের কলেজছাত্র মিল্টন হোসেন। তাঁদের মধ্যে খোরশেদ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের মিটার রিডার এবং বাকি তিনজন বেসরকারি বিদ্যুৎকর্মী।

স্থানীয়রা জানায়, ঝড়ের কারণে হাতীবান্ধা-ভেলাগুড়ি-কাশিমবাজার ১১ কিলোভোল্ট ফিডার লাইনের একটি তার মাটিতে ছিঁড়ে পড়ে। যা ঘটনার কয়েক দিন পরও মেরামত করেনি বিদ্যুৎ বিভাগ। সেই তারটি ৫ এপ্রিল দুপুরের দিকে জোড়া লাগাতে যান ওই চার শ্রমিক। এ সময় উকিল মিয়া খুঁটির ওপরে ওঠেন। বাকি তিনজন ছিঁড়ে পড়া তারটি ধরে থাকেন। কাজ শুরুর কিছুক্ষণ পরই লাইনে বিদ্যুৎ সঞ্চালন চালু হলে সবাই বিদ্যুতায়িত হয়ে পড়েন। মারা যান চারজন।এ ঘটনার পর বিষয়টি ধামাচাপা দিতে বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন তদবির শুরু করেন। তাঁরা হাতীবান্ধার এক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার আশ্রয় নেন।

ওই নেতা নানা কৌশলে প্রতিটি পরিবারকে নামমাত্র ক্ষতিপূরণ নিয়ে দিয়ে বাঁচিয়ে দেন তৎকালীন আবাসিক প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলামকে। এদিকে এ ঘটনার বছর তিনেক আগে আরেক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী মোস্তাফিজার রহমান। তাঁর বাড়ি কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায়। কালীগঞ্জের একটি সঞ্চালন লাইনের ওপর পড়ে থাকা গাছের ডাল কাটার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। প্রথমে ওই লাইনে বিদ্যুৎ সঞ্চালন বন্ধ থাকলেও কাজ শুরুর কিছু সময় পর সংযোগ দেওয়া হয়। ফলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি ছিটকে মাটিতে পড়ে মারা যান।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২ জুলাই ক্ষেতে মাছ ধরতে গিয়ে কালীগঞ্জ উপজেলার দলগ্রামের একটি ক্ষেতে পড়ে থাকা খোলা তারে জড়িয়ে প্রাণ হারায় এক পরিবারের তিনজন। তারা হলো বাকপ্রতিবন্ধী মা পারুল বেগম ও তাঁর দুই সন্তান রানা মিয়া ও ঋতু মনি। এর আগে ২০১৪ সালের ১ অক্টোবর একই উপজেলার বারাজান গ্রামে ঘাস কাটতে গিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা তারে জড়িয়ে মারা যান শিশু বালা। তাঁকে উদ্ধার করতে গিয়ে প্রাণ হারান তাঁর মেয়ে আরতী রাণী।

এ বিষয়ে লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) আবুল ফয়েজ মো. আলাউদ্দিন খান বলেন, কর্তৃপক্ষকে যথাযথ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আর যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটে সে জন্য সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য