মাসুদ রানা পলক, ঠাকুরগাঁও থেকেঃ সমাজসেবার এ কেমন রোগীসেবা, অবশেষে ঠাকুরগাঁও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষর অবহেলা ও চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন সেই অজ্ঞাত ভারসাম্যহীন বৃদ্ধা।

বরিবার সকালে ওই অজ্ঞাত বৃদ্ধা মৃত্যু বরণ করেছে বলে হাসাপাতাল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছেন।

জানা গেছে, শনিবার রাতে সড়ক দূর্ঘনায় রাণীংশকৈল উপজেলায় আহত হয়ে ঠাকুরগাঁও হাসাপতালে ভর্তি করে দিয়ে দিলেন জনৈক মনির নামে এক ব্যক্তি। জরুরি বিভাগ থেকে প্রাথমিক চিকিৎসার দেওয়ার পরেই ওই বৃদ্ধাকে হাসপাতালের সিড়ির নিচে রাখা হয়। অতিরিক্ত রক্তক্ষরন ও ঠান্ডা জনিত কারণে মৃত্যু হয়েছে বলে আসে পাশের রোগীরা অভিযোগ করেছেন।

হাসপাতালের খায়রুল ইসলাম নামে এক রোগীর স্বজন জানান, আহত অবস্থায় বৃদ্ধাকে একটি টলিতে নিয়ে এসে কয়েকজন ওয়ার্ডবস রেখে চলে যায়। তারপরে ওই বৃদ্ধা ব্যথায় কাতরাচ্ছিলা, অবশেষে ঘুময়ে পড়ে। আমরা নার্সকে বার বার অবহিত করার পরেও কেউ রোগীটিকে দেখেতে আসেনি আর। সকালে শুনি ওই বৃদ্ধাটি মারা গেছে।

গড়েয়া এলাকায় ইসরাফুল জানান, চিকিৎসার অবহেলায় কারণে ওই রোগীদের মৃত্যু হয়েছে। আমি হাসপাতালে নিজ চোখের তার মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ার দৃশ্য দেখেছি। তবুও আসেনি কোন ডাক্তার বা নার্স। এই হচ্ছে আমার দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা।

ঠাকুরগাঁও সিভিল সার্জন ডা: আবু মো: খায়রুল কবির অবহেলায় মৃত্যুর কথা অস্বীকার করে বলেন, হাসাপাতালে জায়গা না থাকার কারণে ওই রোগীকে মেঝেতে রাখা হয়েছিল। কিন্তু রোগীর পর্যাপ্ত সেবা অব্যাহত ছিল। অতিরিক্ত ব্যথা ও রক্তক্ষরনের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত ডা: মেহেদী হাসান জানান, ওই অজ্ঞাত বৃদ্ধা দূর্ঘটনায় আহত হয়ে দুই পায়ে গুরুতর আহত হয়েছেন। তাকে প্রাথিমক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল।

ঠাকুরগাঁও আধুনকি সদর হাসপাতালে ২০১৬ ও ২০০১৭ সালে অজ্ঞাত পরিচয়ে রোগী ভর্তি হয়েছেন ৮০ জন। তাদের মধ্যে মারা গেছেন ১০ জন। স্বজন খুঁজে পেয়েছেন ৩০ জন। বাকিরা চিকিৎসা শেষে নিজে থেকেই হাসপাতাল ছেড়ে যান।

ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে অসহায় ও অজ্ঞাত রোগীদের সাহায্য-সহযোগিতা করার জন্য সরকারি হাসপাতালে রয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তরের একটি ‘হাসপাতাল সমাজসেবা কার্যালয়’।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, এসব রোগীর দু’জন ছাড়া ৭৮ জনই পাননি সমাজকসেবা অফিসের কোনো সাহায্য-সহযোগিতা।

শুধু ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালই নয়, সেব উপজেলা হাসপাতালে সমাজসেবা অধিদপ্তরের ‘হাসপাতাল সমাজসেবা অফিস’ রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব অফিস থেকে গরিব ও অজ্ঞাত রোগীরা তেমন কোনো সেবা পান না। এ ব্যাপারে সিভিল সার্জন ডা: আবু মো: খায়রুল কবির বলেন, ‘অসহায় ও অজ্ঞাত রোগীদের অনেকেই সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে সাহায্য-সহযোগিতা না পাওয়ার বিষয়টি আমিও শুনেছি। এমন সব রোগীই যাতে হাসপাতাল সমাজসেবা কার্যালয় থেকে সেবা পান, সেটি নিশ্চিত করতে আমি কাজ শুরু করেছি। শিগগির এর সুফল পাওয়া যাবে।’

হাসপাতালগুলোতে থাকা সমাজসেবা অফিস সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এ সময়ের বাইরে দুস্থ রোগী এলে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া ওই অফিস থেকে অজ্ঞাত রোগীদের খোঁজ করা তো দূরের কথা, তাদের খোঁজ-খবর নিতে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর হাসপাতালে যাওয়ার নজির নেই।

রোগীদের প্রতি সমাজসেবা অফিসের এমন নানা অবহেলার অভিযোগ রয়েছে। এ জন্য একে অপরকে দুষছেন চিকিৎসক ও সমাজসেবা কর্মকর্তারা। স

ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে অজ্ঞাত ও অসহায় রোগীদের সেবা-শুশ্রূষা করে আলোচনায় উঠে আসা নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এককর্মী নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘অসহায় স্বজনহীন রোগীদের বেশিরভাগই চলাফেরা করতে পারে না। ভর্তি হওয়ার পর অনেক সময় জ্ঞানই থাকে না অনেকের। ফলে সহযোগিতার জন্য হাসপাতালের সমাজ সেবা অফিসে তারা যেতে পারেন না।

এ ক্ষেত্রে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরই এগিয়ে আসার কথা। অথচ এ ধরনের কোনো দৃষ্টান্ত আমার নজরে পড়েনি। ঠাকুরগাঁও হাসপাতাল ছাড়াও জেলার ৪ উপজেলায় রোগী কল্যাণ সমিতি রয়েছে। হাসপাতালে সমাজসেবা অধিদপ্তরের তিনজন এবং রোগী কল্যাণ ফান্ডের বেতনে আরও তিন জনসহ মোট ৪/৫ কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন।

বিষয়টি দেখভালের জন্য বিভাগীয় শহরের হাসপাতালগুলোতে একটি কমিটি রয়েছে। সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের পরিচালক কমিটির সভাপতি ও সমাজসেবা কর্মকর্তা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

ঠাকুরগাঁও হাসপাতালের সমাজসেবা অফিসার জামাল উদ্দিন বলেন, ‘কোনো রোগীর সহযোগিতার প্রয়োজন হলে হাসপাতালের ওয়ার্ড থেকে চিকিৎসকরা সুপারিশ করে রোগী কল্যাণ সমিতি অফিসে পাঠান। তখন আমরা তাদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। গত বছর অজ্ঞাত ১০ রোগীকে সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে।’

ঠাকুরগাঁও হাসপাতাল রোগী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও সমাজসেবা কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় চিকিৎসকদের ওপর নির্ভর করতে হয়। ওয়ার্ড থেকে তারা রোগীদের না পাঠালে আমাদের কিছু করার থাকে না। কেউ আমাদের কাছে এলে সাধ্যমতো সেবা দিয়ে থাকি। আবার অনেক সময় নিজেরাই দুস্থ রোগীর খোঁজ নিয়ে সহযোগিতা করি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঠাকুরগাঁও হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, বিভিন্ন সময় সামজসেবা অফিসে সাহায্যের জন্য গরিব রোগীদের পাঠালেও নানা অজুহাতে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। অনেক চেষ্টা ও দৌড়ঝাঁপ করার পরও তিনি রোগী কল্যাণ অফিস থেকে কোনো সহযোগিতা পাননি বলে জানান তিনি।

হাসপাতাল সমাজ সেবা অফিস সূত্রে জানা গেছে, সদ্যসমাপ্ত বছরের শেষ ছয় মাসে ঠাকুরগাঁও হাসপাতালের সমাজসেবা কার্যালয়ে বিভিন্ন খাতে প্রায় ৩ লক্ষ টাকা পেয়েছে। সরকারি বরাদ্দ ছাড়াও যাকাত, মানুষের দান-অনুদান থেকে অর্থ পায় সমাজসেবা সমিতি। ওই অর্থ থেকে দুস্থ, অসহায় ও অজ্ঞাত রোগীদের কল্যাণে ব্যয় করা হয়। বিশেষ করে রোগীর ওষুধ-পথ্য, পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। অথচ অনেক রোগীই এ সহায়তা পান না।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য