দিনাজপুরে রাস্তার দু’ধারে গাছ কাটা নিয়ে ব্যাপক দুর্ণীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় অর্ধ কোটি টাকা মূল্যের গাছ বিক্রি করা হয়েছে নামমাত্র সোয়া ৭ লাখ টাকা মূল্যে। শুধু তাই নয়, রাস্তায় যে পরিমাণ ও নিয়মে গাছ কাটার কথা বলা হয়েছে তা না মেনেই এসব গাছ কাটা হচ্ছে। আর এসব অনিয়মের সঙ্গ দিচ্ছেন খোদ সরকারী কর্মকর্তারাই।

দিনাজপুর সড়ক ও জনপদ বিভাগ ও বন বিভাগ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, দিনাজপুর থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে ৩ দশমিক ৭ মিটার থেকে ৫ দশমিক ৫ মিটার রাস্তা প্রশস্ত করা হচ্ছে। এই প্রশস্ত করার জন্য রাস্তার দু’ধারে ৬ ফিটের মধ্যে থাকা গাছ কাটার জন্য সড়ক ও জনপদ বিভাগ থেকে বিভিন্ন কার্যালয়ে চিঠি দেয়া হয়।

সেই মোতাবেক দিনাজপুর বন বিভাগ দিনাজপুর সদর উপজেলায় ৬৪টি ও চিরিরবন্দর উপজেলায় ৮০টি গাছ কাটা হবে মর্মে নির্ণয় করে। একইসাথে এসব গাছের মূল্য ধরা হয় ৭ লাখ ২৫ হাজার ৭৭২ টাকা। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৬৪টি গাছের মূল্য নির্ধারন করা হয় ৫ লাখ ৪২ হাজার ৯০৪ টাকা এবং চিরিরবন্দর উপজেলায় ৮০টি গাছের মূল্য নির্ধারন করা হয় ১ লাখ ৮২ হাজার ৮৬৮ টাকা।

স্থানীয় ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ঠিকাদারের সাথে সরকারী কর্মকর্তাদের যোগসাজসে নামমাত্র মূল্যে এসব গাছ বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। যেখানে বাজারে প্রতি সেফটি কাঠের মূল্য গড়ে প্রায় ৮ থেকে ৯ শ’ টাকা সেখানে ১৪৪টি এসব গাছের মূল্য নির্ধারন করা হয়েছে মাত্র সোয়া ৭ লাখ টাকা। এসব গাছের মূল্য প্রায় অর্ধকোটি টাকা বলে জানিয়েছেন তারা। তাছাড়া শিডিউলে নেই এমন গাছও ইতিমধ্যে কর্তণ করা হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি দুর্ণীতি ও অনিয়ম হচ্ছে দিনাজপুর সদর উপজেলায়। যেখানে শিডিউলের বাইরের গাছও কেটে ফেলা হয়েছে। আবার শিডিউলে উল্লেখ না থাকলেও কাটা হচ্ছে অন্য গাছের বড় বড় মগডাল। যা ঠিকাদারের বাড়তি উপর্জনের পথ। এসব গাছ কাটার জন্য দায়িত্ব পেয়েছেন জেলা শহরের ঠিকাদার রাজু। দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই তিনি এসব গাছ কাটার মহাযজ্ঞ শুরু করেছেন। এলাকাবাসী জানিয়েছে, এসব অনিয়মের বিষয়েগুলো সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ দিলেও কোন কাজ হচ্ছে না।
এলাকাবাসী জানায়, রাস্তায় যেসব গাছ কাটা হয়েছে তা করা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। ফলে কোনটি মার্ক করা আর কোনটি মার্ক করা নয় এসব বিষয়গুলো সঠিকভাবে বোঝা যাচ্ছে না। আর এই সুযোগটিকেই কাজে লাগানো হচ্ছে। তাছাড়া যেসব গাছ কাটার কথা বলা হয়নি সেসব গাছও কাটা হচ্ছে, কোনটির আবার গাছের ডাল কাটা হচ্ছে যা শিডিউলের মধ্যে উল্লেখ নেই।

দিনাজপুরে কাঠ ব্যবসায়ী আব্দুস কুদ্দুস ও রফিকুল ইসলাম জানান, বর্তমানে প্রতি সেফটি কাঠের মূল্য গড়ে প্রায় ৮ থেকে ৯শ’ টাকা। এক একেকটি গাছে গড়ে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ সেফটি কাঠ হবে। তাছাড়া রয়েছে খড়ির জন্য কাঠও। এতে করে একেকটি গাছের মূল্য কোনক্রমেই ৪০ হাজার টাকার কম নয়। অথচ এখানে গাছগুলো বিক্রি করা হয়েছে নামমাত্র মূল্যে। এতগুলো গাছের মূল্য কিভাবে এত কম হয় এমন প্রশ্ন তাদের।

দিনাজপুর শেখপুরা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আরিফ আলী তালুকদার ডাবলু জানান, শিডিউল মোতাবেক যে পরিমাণ গাছ কাটার কথা তা করা হয়নি। কোন কোন স্থানে একটির জায়গায় দু’টি কিংবা ততোধিক পরিমাণ গাছ কাটা হয়েছে। উদাহরন হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন শিডিউলে রাজারামপুর মৌজায় ১টি মহুয়া গাছ কাটার নির্দেশ থাকলেও কাটা হয়েছে ৩টি মহুয়া গাছ। তাছাড়া সড়ক থেকে ৬ ফুটের মধ্যে গাছ কর্তণ করার কথা থাকলেও এই পরিমাণ জায়গার বাইরের গাছও কাটা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

দিনাজপুর সড়ক ও জনপদ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী খ.ম. নাকীবুল বারী জানান, রাস্তা প্রশস্ত করার জন্য রাস্তা থেকে ৬ ফুটের মধ্যে থাকা গাছ কাটতে বলা হয়েছে স্ব স্ব মালিকানাধীন দপ্তরগুলোকে। এজন্য কোন কোন গাছ কাটা হবে এবং এর মূল্য কত হবে তা নির্ণয় করেছে বন বিভাগ। এখানে কোন অনিয়ম হয়ে থাকলে সেটি তাদের দেখার বিষয় নয়।

দিনাজপুর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আব্দুল আউয়াল সরকার জানান, গাছগুলো নির্ণয় করে এর ন্যুনতম একটি মূল্য ধরা হয়েছে। যাতে করে এর কম মূল্য না হয় সেজন্য এটি নির্ধারন করা। যে বেশি মূল্য দিবে নিয়ম মোতাবেক সেই গাছ কর্তণের দায়িত্ব পাবে। গাছগুলোর রকমসহ যাবতীয় বিষয়গুলো বিবেচনায় এটি করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

গাছগুলো কর্তণের দায়িত্ব প্রাপ্ত ঠিকাদার রাজু জানান, এখানে শিডিউলের বাইরে কোন গাছ কাটা হয়নি। তাছাড়া এটি দেখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের। গাছ কাটায় কোন অনিয়ম বা দুর্ণীতি হচ্ছে না। যেসব গাছে মার্কিং করা আছে সেগুলোই কাটা হচ্ছে।

চিরিরবন্দর উপজেলায় ৮০টি গাছ কর্তণ কমিটির সদস্য সচিব ও উপজেলা সহকারী ভুমি কমিশনার মাশফাকুর রহমান জানান, গাছগুলোর মূল্য নির্ধারন করেছে বন বিভাগ। এসব গাছের মূল্য কেন কম ধরা হয়েছে সেটি বন বিভাগের দেখার দায়িত্ব। তবে গাছ কর্তনের ব্যাপারে অনিয়ম হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সদর উপজেলায় ৬৪টি গাছ কর্র্তণ কমিটির আহ্বায়ক সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুর রহমান গাছগুলোর কম মূল্য নির্ধারনের বিষয়ে তিনি জানান, এটি বন বিভাগের দেখার দায়িত্ব। কেন বন বিভাগ এত কম মূল্য নির্ধারন করেছে তা তিনিও জানেন না। তিনি জানান, যদি গাছ কর্তণে কোন ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকে বা শিডিউলের বাইরে গাছ কাটা হয় তাহলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য