আজিজুল ইসলাম বারী,লালমনিরহাট প্রতিনিধি: একটি ছবি খুব সহজেই যেমন হাজার মানুষের হৃদয় নাড়িয়ে অনেক কিছু বুঝিয়ে দেয়, ঠিক তেমনি আবার একটি ছবি হাজার লক্ষ শব্দের সমান। কয়েক হাজার শব্দ ব্যবহার করে যা বোঝানো সম্ভব নয় তা খুব সহজেই একটি ছবির মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব। প্রত্যেকটি মানুষ তার জীবনের সকল কর্মকান্ডের মাধ্যমে সফলতা খোঁজেন। অনেককে সফলতার পেছনেই ছুটতে দেখা যায় বেশীরভাগ সময়। জীবনটাকে উন্নত করতে হলে জীবনে আনতে হবে সফলতা। বর্তমানের এই যুগে মানুষজন সফল মানুষকেই তোয়াজ করে চলেন, তাদেরই জয়জয়কার চারিদিকে।

এসব দেখে প্রত্যেকেই স্বপ্ন বোনেন একদিন সফল ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলবেন। সফল মানুষদের জীবনী ঘাঁটলে দেখা যায় তারা কতোটা ত্যাগ-তিতিক্ষা শেষে আজকের এই সফল মানুষ। আমি এত্তখান যার কথা বলছিলাম, তিনি আর কেউ নয়, তিনি লালমনিরহাট শহরের বিডি আর হাট এলাকার শারীরিক প্রতিবন্ধী মাসুম পারেভজ। তিনি নিজেই শারীরিক প্রতিবন্ধী হলেও প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে স্বপ্ন আকঁছেন।আদরের ছোট ভাইটি বিয়ের আগে ব্লাড ক্যান্সারে মারা গেলে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন প্রতিবন্ধী মাসুম মিয়া।

ভাইয়ের স্মৃতি আর ‘চাচ্চু’ ডাক শুনতে এতিম শিশুদের জন্য খুলেন এতিমখানা।২০১৩ সালে দুই শিশু নিয়ে যাত্রা শুরু করে চার বছরে এতিম শিশুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৩০ জনে। এই এতিম শিশুদের থাকা-খাওয়া, লেখাপড়া, পোশাক-পরিচ্ছেদ ও চিকিৎসা খরচসহ পুরো ভরণপোষণের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন মাসুম পারভেজ। অথচ তিনি নিজেও প্রতিবন্ধী।চলেন ক্রেসে ভর করে। তবুও এতিমদের প্রতি ভালোবাসার কমতি নেই তার। শত ব্যস্ততার মাঝেও প্রতিদিন এতিম শিশুদের সঙ্গে ইফতার করেন ও সাহরি খান তিনি।প্রতিবন্ধী মাসুম পারভেজ লালমনিরহাট শহরের বিডিআর হাট এলাকার সাবেক কমিশনার মোক্তার আলীর ছেলে। মাসুম পারভেজ এই প্রতিবেদকে জানান, জন্মের ৬ মাস পরে পোলিও রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। সেই থেকে তার প্রতিবন্ধী জীবন শুরু।

৪ ভাইবোনের মধ্যে তিনি মেঝো। একমাত্র ছোট ভাই মাসুদ রানা ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে অকালে পরপারে পাড়ি জমান। ফলে একা হয়ে পড়েন তিনি। বিয়ে করে ৩ সন্তানের জনক হলেও চাচা হওয়ার সৌভাগ্য হয়নি তার।তাই চাচ্চু ডাক শুনতে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে এতিম শিশুদের জন্য এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। তার প্রতিষ্ঠিত এতিমখানার নাম তালুক খুটামারা মোক্তারটারী মাসুদ রানা হাফেজিয়া মাদরাসা।এই এতিমখানার সকল শিশু মাসুদ রানাকে চাচ্চু বলে ডাকে। এতিমখানার শিক্ষক ও কেয়ারটেকারের বেতনসহ শিশুদের যাবতীয় খরচ মেটাতে প্রতি মাসে ৩০ হাজারের বেশি অধিক টাকা খরচ হয়।

এতিমখানার খরচ মেটানোর বিষয়ে মাসুম পারভেজ জানান, পৈত্রিক বাসাবাড়ি থেকে প্রাপ্ত ভাড়া ও সারের (ডিলার) ব্যবসার আয়ে চলে তার সংসার। ব্যবসার পরিধি বাড়াতে ব্যাংকের কাছে ঋনের আবেদন করে ঋণ পাননি। তাই অল্পপুঁজি দিয়েই চালিয়ে নিচ্ছেন সবকিছু।প্রতিবন্ধী হওয়ায় নিজে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বঞ্চিত হলেও এতিমখানা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তিনি বলেন, ছোট ভাই বেঁচে থাকলে সংসারের অর্ধেকের মালিকানা পেত। আমি চাচ্চু ডাক শুনতাম। কিন্তু ভাই নেই, তাই চাচ্চু ডাক শুনতে ও ভাইয়ের স্মৃতি ধরে রাখতে এতিমখানাটি প্রতিষ্ঠা করে এসব শিশুর শিক্ষার ব্যবস্থা করেছি। কাজের ফাঁকে তাদের নিয়ে মাঝে-মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় বেড়াতে যাই। এতে তাদেরও যেমন ভালো লাগে, আমারও ভালো লাগে। এসব শিশুকে প্রতিষ্ঠিত করে আজীবন চাচ্চু ডাক শুনাই তার লক্ষ্য বলে জানান তিনি।

একজন প্রতিবন্ধীই অন্য প্রতিবন্ধীর কষ্ট সম্পর্কে বুঝতে পারে। বিষয়টি অনুধাবন করে তিনি প্রতিবন্ধী শিশুদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য পৃথক ফান্ড গঠন করেছেন। সেখান থেকে প্রতিবন্ধীদের সহায়তা করা হয়- বলেন মাসুম।তিনি বলেন, প্রতিবন্ধীদের সমাজের বোঝা না ভেবে, তাদের সহায়তা করলে তারাও সমাজে অবদান রাখতে সক্ষম হবে। এভাবে দিনে দিনে এতিম ও প্রতিবন্ধীদের ভরসাস্থলে পরিণত হয়ে উঠছেন প্রতিবন্ধী মাসুম পারভেজ।অবশ্য কথার ফাঁকে এতিম ও প্রতিবন্ধীদের সহায়তায় সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসারও আহবান জানান তিনি।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য