আজিজুল ইসলাম বারী,লালমনিরহাট প্রতিনিধি:লালমনিরহাট সদর উপজেলার মোগলহাট ইউনিয়নের দুরাকুটি এলাকার অতুল চন্দ্র বর্মণ। ছেলেবেলা থেকেই অভাবের সঙ্গে নিত্যযুদ্ধ তার। অভাবের কারণেই এসএসসির পর আর লেখাপড়া করতে পারেননি। কিন্তু তাতে দমে না গিয়ে প্রবল উদ্যমে ভর করে ফিরিয়েছেন নিজের ভাগ্য। উচ্চফলনশীল জাতের বিভিন্ন সবজিবীজ উৎপাদনের মাধ্যমে অর্জন করেছেন সচ্ছলতা। আর এতে তার সফলতা এতটাই যে, এ অঞ্চলে অনেকের কাছেই তিনি এখন অনুকরণীয়।

জানা যায়, দরিদ্র কৃষক পরিবারের এ মানুষটিকে কিশোর বয়স থেকেই পিতার সঙ্গে মাঠে কাজ করতে হয়েছে। কিন্তু তার পিতা পিশুলাল অভাবের কারণে নিজের অধিকাংশ জমিই বিক্রি করে দেন। অবশিষ্ট যেটুকু ছিল, তাও বন্ধক রাখতে বাধ্য হন। ওই সময়েই অতুলকে সংসারের হাল ধরতে হয়। কৃষিকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে ফজর আলী নামে এক ব্যক্তির জমিতে বর্গাচাষ শুরু করেন তিনি।

নিজের পায়ে দাঁড়াতে প্রবল উদ্যমী মানুষটি কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে কিছু সঞ্চয় করেন। আর ওই সঞ্চয় দিয়েই ২০০৮ সালে উচ্চফলনশীল (হাইব্রিড) জাতের করলার বীজ উৎপাদনে মনোযোগ দেন। এজন্য তিনি ফজর আলীরই এক একর জমি লিজ নেন। বীজ উৎপাদনে সফলতা পান প্রথম বছরেই। এর পর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে বীজ উৎপাদনের পরিসর। উচ্চফলনশীল শস্যবীজ উৎপাদন করে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি অতুল বর্মণকে। একপর্যায়ে পিতার বন্ধক রাখা জমিও ফেরত নিতে শুরু করেন তিনি।

২০১৫ সালে উৎপাদিত বীজ বিক্রি করে সঞ্চয়ের ২৩ লাখ টাকা দিয়ে নিজেই দুই একর জমি কেনেন। তৈরি করেছেন নতুন বাড়িও। আর এভাবে তিনি যে শুধু নিজের ভাগ্য বদলেছেন, তাই নয়। তার এ বীজ উৎপাদন আরো ২০টি পরিবারের নারীদের কর্মসংস্থান করেছে। প্রতিদিন ৪-৫ ঘণ্টা কাজ করে তারা প্রত্যেকে মাসে ৩-৪ হাজার টাকা আয় করছেন।

বর্তমানে এ ইউনিয়নে অতুল চন্দ্র বর্মণ একজন অনুকরণীয় মানুষ। তার সাফল্য আর ভাগ্য বদলের গল্প অনুপ্রাণিত করছে এখানকার বহু কৃষককে। কৃষকরা তাকে অনুকরণ ও অনুসরণ করেই বিভিন্ন ধরনের সবজির বীজ উৎপাদনে ঝুঁকছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, এ বছর টমেটো, মরিচ ও কপির বীজ উৎপাদনের পর এখন দেড় একর জমিতে নতুন করে চাষ দিয়েছেন।

এছাড়া এক বিঘা জমিতে বেগুনবীজ উৎপাদনের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সংসারের খাদ্য চাহিদা মেটাতে চাষ করেছেন ইরি ধানও। আর সবকিছু সামলাতে তাকে সাহায্য করছেন তার স্ত্রী লতা রানী।কথা হলে অতুল চন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘আমি যখন সংসারের হাল ধরি, তখন আমরা জমিজমা বিক্রি ও বন্ধক রেখে নিঃস্ব্ব। কৃষিকাজের একপর্যায়ে হঠাত্ই উচ্চফলনশীল সবজিবীজ উৎপাদনের চিন্তা মাথায় আসে। সে অনুযায়ী চেষ্টাও করি।

এর পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। টমেটো, করলা, মরিচ, পেঁপে, বেগুনসহ বিভিন্ন সবজির বীজ উৎপাদন শুরু করি। বিভিন্ন কোম্পানির কাছে বীজও দিতে থাকি। এখন আমার কোনো অভাব নেই। নিজেই প্রায় ২০টি পরিবারের কর্মসংস্থান করেছি।’সীমান্তবর্তী পিছিয়ে থাকা এ জনপদের অনেকেই এখন অতুল চন্দ্র বর্মণের মতো ভাগ্য বদলে অবিরাম সংগ্রাম করছেন।

আর তাদের অনুপ্রেরণা অতুল।মোগলহাট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান বলেন, ‘দুরাকুটির অতুল চন্দ্র বর্মণের সাফল্য দেখে অনেকেই এখন সবজি চাষের পাশাপাশি হাইব্রিড বীজও উৎপাদন করছেন।’কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এসব কৃষককে বীজ উৎপাদনে সহযোগিতা ও পরামর্শ প্রদানের জন্য সরকারি তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। তারা নিজেরাই মেধা ও শ্রম খাটিয়ে অবিরাম সংগ্রাম করে যাচ্ছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের লালমনিরহাট জেলা মার্কেটিং অফিসার আব্দুর রহিম বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে খান সিড নামে একটি উচ্চফলনশীল বীজ উৎপাদন ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান আছে। অনেক চাষী বীজ উৎপাদন করে বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির কাছে বিক্রি করছেন। আর বীজ উৎপাদনে কৃষক পর্যায়ে উদ্বুদ্ধ করার জন্য কৃষি বিভাগ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।’

সহযোগিতা না করার অভিযোগ অস্বীকার করে লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ডিডি) বিধু ভূষণ রায় বলেন, ‘আমরা কৃষকদের সব ধরনের প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। এসব কেউ অধিক ফলনের জন্য, কেউ সংরক্ষণের জন্য ও কেউ বা বীজ উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করছে।’ কৃষকদের সঙ্গে অধিদপ্তরের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য