বিরলের ৫ জয়িতার জীবন থেকে নেয়া সংক্ষিপ্ত বৃত্তান্তে উঠে এসেছে নারীর জীবন সংগ্রামের ঐত্যিহাসিক ঘটনা। “জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ” এর আওতায় উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক মনোনীত (৫ ক্যাটাগরীতে) সফল জননী নারী, অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী, সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদানে নারী, শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সফল নারী ও নির্যাতনের বিভিষীকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যোমে নারী এর জয়িতাদের জীবনে ঘটে যাওয়া অতীত জানতে গিয়ে বেড়িয়ে এসেছে এসব তথ্য।

সফল জননী নারী’র জীবন কাহিনী থেকে জানা গেছে, উপজেলার মঙ্গলপুর ইউপি’র রঘুনাথপুর গ্রামের ১৯৮২ সালে একজন রিক্সাভ্যান চালকের ঘরে জন্ম নেন শেফালী রাণী। অর্থ অভাবে ৪র্থ শ্রেণী পর্যন্ত লেখা পড়ার সুযোগ হয় আর ১৪ বছর বয়সে পাশ্ববর্তী মাহাতাবপুর গ্রামের একজন ভ্যানচালকের সাথে বিয়ে হয়। ২ ছেলে ও ১ মেয়ের জন্ম হয় দাম্পত্য জীবনে। শাশুড়ী দীপশিখা নামক একটি এনজিও প্রতিষ্ঠানের সদস্য থাকা অবস্থায় মৃত্যু বরণ করলে শেফালী রাণী সেখানে সদস্য পদ পেয়ে ঋণ গ্রহণ করে প্রথমে ছাগল ক্রয় করেন। এরপর ছাগলের ঋণ পরিশোধ করে পরের বছর গরুর ঋণ গ্রহণ করেন। এরপর জীবনসংগ্রামে গরু-ছাগল পালন করে প্রথমে বাড়ী ভিটার জন্য ৬ শতক জমি ক্রয় করেন। পরে ঋণের পরিধি ও গরু-ছাগল সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি ১৫০ শতক আবাদী জমি ক্রয় করেন। শেফালী রাণীর বড় ছেলে বুয়েটে ১ম বর্ষের ছাত্র, মেঝো ছেলে দিনাজপুর পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটে ১ম বর্ষের ছাত্র ও একমাত্র মেয়ে ৯ম শ্রেণিতে পড়ছে। ভ্যানচালকের পরিবার থেকে ৩ সন্তানকে লেখাপড়ায় এগিয়ে নিয়ে সংসার পরিচালনা করে একজন সফল জননী হিসাবে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।

অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারীর জীবন কাহিনী থেকে জানা গেছে, বিরল পৌরশহরের বিরল বাজারের আলহাজ্ব আনোয়ার আলীর কন্যা মঞ্জিলা পারভীন ময়না ২০০০ সালে বিয়ের ২ বছর পর এক কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস হঠাৎ করে স্বামী প্যারালাইসিস রোগে আক্রান্ত হয়ে ব্যয়বহুল চিকিৎসা খরচ মিটাতে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। এক বেলা খাবার যোগাড় করার চিন্তায় দিন কাটতো তাঁর। হঠাৎ ময়ানার ছোট চাচা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে তিন হাজার টাকা দিলে সেখান থেকে ৮০০ টাকা ভাড়ায় দোকান নিয়ে একটা সেলাই মেশিন ক্রয় করে। কারো নিকট থেকে হাতে কলমে শিক্ষা না নিয়েই সে মনের ধারণা থেকে কাজগ কেটে সেলাই এর পাশাপাশি বিউটি পার্লারের কাজ শুরু করে। এভাবে সেলাই ও বিউটি পার্লারের পাশাপাশি আয়ে বর্তমানে ৪ টি সেলাই মেশিন ও টেইলারিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চলছে তাঁর। মেয়ের ৯ম শ্রেণীতে পড়ছে। আর্থিক স্বচ্ছলতার পাশাপাশি সংসার চালিয়েও সঞ্চয় প্রায় ৩ লাখ টাকা হয়েছে ময়নার।

সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রাখা নারীর জীবন কাহিনী থেকে জানা গেছে, ৫নং বিরল ইউনিয়নের বিনোদপুর গ্রামের ধাবুল চন্দ্র রায়ের স্ত্রীয় সুনিতি বালা ২০০৯ সালে আরডিআরএস বাংলাদেশের সহযোগিতায় ইউনিয়ন ফেডারেশন গঠন করা হলে সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আরডিআরএস এর মাধ্যমে তিনি দক্ষতা ও শালিস বিষয়ে প্রশিক্ষণ পেয়ে সচেতনতামূলক বক্তব্য দিয়ে ফেডারেশনের দল গঠন করেন, যার সদস্য সংখ্যা ৫০০জন। তিনি বাল্য বিবাহ, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, ব্যল্য বিবাহের কুফল সম্পর্কে আলোচনা করে সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বিভিন্ন শালিস বৈঠকে নারী সমাজের নেতৃত্ব দিয়ে ক্ষতিপূরণ আদায়সহ সমস্যা সমাধানে াগ্রণী ভ’মিকা পালন করে চলছেন। তিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বরগণের সহযোগিতায় গরীব, অসহায় পরিবারদের মাঝে ইউনিয়ন পরিষদের সুযোগ সুবিধাগুলো প্রদানের মাধ্যমে সমাজে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি সকলের মাঝে একজন নারী নেতৃ হিসাবে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছেন।

শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারীর জীবন কাহিনী থেকে জানা গেছে, উপজেলার ভান্ডারা ইউপি’র বেতুড়া গ্রামের মরহুম মহরম আলীর মেয়ে শাহীমা খাতুন সানু ২ বোন ও ১ ভাইয়ের সংসারে মায়ের যতেœ অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে ছাগল পালন করে প্রাথমিকে শিক্ষকদের সহায়তা নিয়ে এবং মাধ্যমিকে ডঁউশনি করে পড়া লেখা চালিয়ে এসেছেন। বাড়ী থেকে ১০ কিমি দূরে অর্ধেক রাস্তা পায়ে হেটে কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে পরীক্ষা দিয়ে সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে কাজের সন্ধানে ছুটেন। বিরল এডিপি ওয়ার্ল্ড ভিশনে কর্ম জীবন শুরু করে বিএসএস পড়ালেখা চালিয়ে নিতে এর পাশাপাশি একটি কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতায় যোগ দেন। বিএসএস পাশ করে সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ে মাষ্টার্স ফাইনাল ইয়ারে দিনাজপুর সরকারী কলেজে পড়ার পাশাপশি ১৩তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় ১লাক ২৮ হাজার রিটার্নে অংশগ্রহণকারীর মধ্যে সিলেক্ট হয়েছে। এখনা ভাইবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে সকলের নিকট ম্যাধমিক বিদ্যায়ে শিক্ষকতা পেশায় যেন যোগদান করতে পারে তাঁর জন্য দোয়া প্রার্থী।

নির্যাতনের বিভিষীকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যোমে জীবন শুরু করা নারীর জীবন কাহিনী থেকে জানা গেছে, বিরল পৌরশহরের লাইনপাড়ার আয়নাল হকের মেয়ে মনিরা আক্তার মনি ২০১০ সালে জেএসসি পাশ করার পর বিয়ে হয়। বিয়ের কিছুদিন সংসার ভালোই কাটলেও গরীব ঘরের সন্তান হওয়ায় কিছুদিন পর নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। বিয়ের ২ বছর পর কন্যা সন্তানের মা হয়। শশুড়ালয় থেকে পিতা-মাতার বাড়ী যাওয়া আসা বন্ধ হলে একপর্যায়ে ২০১৩ সালে ডিভোর্স হয়। ৬মাসের সন্তানকে নানীর নিকট রেখে পিতার পরামর্শে আবারো ৯ম শ্রেণিতে ভর্তি হয়। ২০১৫ সালে সাফল্যের সাথে এসএসসি পাশ করে। এইচএসসি পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার জন্য টিউশনি শুরু করার পাশাপাশি এলাকায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতামূলক কাজ করে যাচ্ছেন। সে এবছর এইচএসসি পাশ করে অনার্সে ভর্তির অপেক্ষায় রয়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য