দিনাজপুর সংবাদাতাঃ পরিকল্পিত হত্যাকান্ডকে সড়ক দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়ার অভিযোগের প্রেক্ষিতে পুলিশ ১১ জুন রোববার মৃত বাবুল হোসেন এর মরদেহ কবর হতে উত্তোলন করেছে।

দিনাজপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট যোবায়ের হোসেন এর নেতৃত্বে কোতয়ালী থানার এসআই মো. আজাদ ও অন্যান্য পুলিশ সদস্যরা ১১ জুন রোববার সাড়ে ১১টার দিকে কাহারোল থানাধীন সুন্দরপুর গ্রামের ছলে মেম্বারপাড়ার পারিবারিক কবরস্থান হতে মৃত বাবুল হোসেন এর লাশ উত্তোলন করা হয়।

লাশ উত্তোলনের সময় মৃত বাবুল হোসেন এর পরিবারের লোকজনসহ কাহারোলের ৫নং সুন্দরপুর ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ড সদস্য শরিফ উদ্দিন, ৩নং ওয়ার্ড সদস্য আসাদুল ইসলাম, ৮নং ওয়ার্ড সদস্য তছির উদ্দিন, কাহারোল থানার এসআই মো. এরশাদ উপস্থিত ছিলেন।

এসময় অসংখ্য এলাকাবাসী ভীড় জমায়। পুলিশ বেষ্টনীর মধ্যে হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদ্বয় কবর হতে বাবুলের লাশ উত্তোলন করে। এসময় পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। অবশেষে লাশ উত্তোলনের ৪০ মিনিট পর দায়িত্বে নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ্যাম্বুলেন্স যোগে মৃত বাবুল হোসেন এর মরদেহ ময়না তদন্তের জন্য এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যায়।

কর্তব্যরত নির্বাহী মেজিষ্ট্রেট যোবায়ের হোসেনকে এ হত্যাকান্ডের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশে আমরা লাশ উত্তোলন করতে এসেছি। এখন ময়না তদন্ত করা হবে। তারপর হত্যার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হবে।

অন্যদিকে লাশ উত্তোলনের পর কর্তব্যরত এসআই মো. আজাদকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, এখন কিছু বলা যাচ্ছে না। ময়না তদন্তের পর সবকিছু জানা যাবে। তবে তিনি বলেন যে, মরদেহের ডান হাতে এবং ডান হাতের বগলের উপরে ও নিচে আঘাতের চিহ্ন আছে।

নিহত বাবুলের স্ত্রী কুলসুম কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, আমি আমার স্বামীর হত্যাকান্ডের সাথে যারা জড়িত তাদের সকলেরই সর্বোচ্চ বিচার চাই।

এদিকে এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডাঃ আমির উদ্দীন মৃত বাবুল হোসেন এর লাশ ময়না তদন্ত করবেন বলে জানা গেছে। তবে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ময়না তদন্তের কোন ফলাফল জানা যায়নি।
উল্লেখ্য, গত ১৫ মে কাহারোল থানাধীন সুন্দরপুর গ্রামের বাদী মো. মকসেদ আলীর পুত্র বাবুল হোসেন একই উপজেলাধীন মানগ্রামের ইয়াজ উদ্দিনের পুত্র আসামী মো. রহিদুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে কীটনাশক ও বীজ এর বকেয়া টাকা উত্তোলনের জন্য কাহারোল বাজারে জনৈক সামাদের কাছে যান।

বাবুল পাওনা টাকা না পেয়ে রাত ১১ টার দিকে রহিদুলের মটর সাইকেলে চড়ে কোতয়ালী থানাধীন জামতলি নামক স্থানে গেলে তার অনুরোধে রাস্তার পার্শ্ববর্তী চায়ের দোকানে চা খায়। এরপর তারা দু’জনই মটর সাইকেলে করে বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। পথিমধ্যে বাবুল চা খাওয়ার পর তাকে খারাপ লাগছে বলে জানায়। কিছুদুর পথ অতিক্রম করার পর ওই অবস্থাতেই বাবুল বুঝতে পারে যে, দুটি মটর সাইকেল তাদের পথ অনুসরন করছে। কিছু বুঝে উঠার আগেই দুষ্কৃতকারীরা মৃত বাবুলের ডান হাতের বাহু ও বগলের উপরে ও নিচে ধারালো চাকু দিয়ে আঘাত করে রক্তাক্ত ও জখম করে।

বাবুল সে সময় চিকৎকার দিয়ে অচেতন হয়ে পড়ে। কিছুক্ষন পর বাবুল সচেতন হলে দেখতে পায় সে দশমাইলের একটি পেট্রোল পাম্পের কাছে পরে আছে। সংবাদ পেয়ে পরিবারের লোকজন এ্যাম্বুলেন্স নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় এবং তাকে উদ্ধার করে দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যায়। সেখানকার ডাক্তাররা জানান যে, তার উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে জরুরী প্রয়োজন।

পরিবারের লোকজন বাবুলকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানকার ডাক্তাররা জানান যে, বাবুলের আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। বাবুলকে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে পিজি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেখানকার ডাক্তারের পরামর্শে তাকে পঙ্গু হাসপাতাল, হৃদরোগ হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়।

এরই মধ্যে বাবুল পরিবারের লোকজনদের কাছে তার এ ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেয়। সর্বশেষ বাবুলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৮ মে ভোর ৪টায় সে মৃত্যুবরণ করে। পরে বাবুলের মৃতদেহ ঢাকা পুলিশের অনুরোধে কাহারোল নিয়ে যাওয়া হয় এবং কাহারোল পুলিশের নির্দেশে কোন রকম ময়না তদন্ত ছাড়াই বাবুলকে দাফন করা হয়।

এদিকে মৃত বাবুলের আত্মীয়-স্বজনরা আসামী রহিদুল ইসলামকে ব্যাপক খোঁজাখুজি করার পরেও না পাওয়ায় তাদের মনে দৃঢ় সন্দেহ জন্মায় যে, রহিদুল অজ্ঞাতনামা লোকজনের মাধ্যমে চায়ে বিষ মিশিয়ে বাবুলকে খাওয়ায় এবং হত্যার পরিকল্পনা করে। তারা বাবুলকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে ডান হাতের বাহু ও বগলের নিচে-উপরের কেটে দেয়। হত্যাকারীরা গুরুতর জখম করে বাবুলকে দশমাইল নামক জায়গায় পেট্রোল পাম্পের পাশে ফেলে রাখে এবং বিষয়টিকে সড়ক দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র করে।

দেরিতে হলেও অসহায় বাদী পক্ষের লোকেরা গত ২৫ মে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে একটি অভিযোগ দায়ের করে। দায়েরকৃত অভিযোগের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট আদালত কর্তৃপক্ষ গত ৩০ মে এক আদেশ জারী করেন। সেই আদেশের প্রেক্ষিতে অভিযোগটিকে ৩ কার্য দিবসের মধ্যে এজাহার হিসেবে অন্তর্ভুক্তকরণ এবং ৭ কার্য দিবসের মধ্যে ভিকটিম এর মরদেহ কবর হতে উত্তোলন করে পুনরায় ময়না তদন্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করার জন্য কোতয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেয়া হয়। তারই প্রেক্ষিতে গতকাল বাবুল হোসেন এর মরদেহ কবর হতে উত্তোলন করা হয়।

এদিকে আদালতে অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রদত্ত আদেশনামার পর আসামী পক্ষ বাদী পক্ষকে এখনো জীবন নাশের হুমকি দিচ্ছে বলে জানা গেছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য