দিনাজপুরের চিরিরবন্দর মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিষয়ের শিক্ষক রফিকুল ইসলামকে (৪৪) হত্যার মামলায় ঘটনার প্রকৃত সত্য আড়াল করে পুলিশ চুড়ান্ত রিপোর্ট আদালতে দাখিল করায় পরিবারের লোকজন ও তার স্ত্রী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে রিপোর্ট প্রত্যাখান করেছে। এব্যাপারে নিখোঁজ রফিকুল ইসলামের স্ত্রী লায়লা আরজুমান্দ গত ৫ জুন/১৭ তারিখে রংপুর জোনের ডিসিপ্লিন এন্ড প্রফেশনাল স্টান্ডার্ড ইন্সপেক্টর অব পুলিশ তরিকুল ইসলামের কাছে কান্নাজড়িত কন্ঠে জানান, পুলিশ প্রয়োজনীয় তদন্ত না করে মামলার আসামীদের কাছে উৎকোচের বিনিময়ে ম্যানেজ হয়ে মামলার চুড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করেছে। এসময় তিনি মামলাটি পিবিআই তদন্তের দাবী জানান।

ঘটনা অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই হত্যার সঙ্গে চিরিরবন্দর থানার তৎকালীন এক এএসআই জাহিদের (বর্তমানে ঘোড়াঘাট থানায় কর্মরত) নাম উঠে আসলেও তদন্তকারী কর্মকর্তা তাকে রক্ষা করতে ও ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে মামলার চুড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করেন। দিনাজপুর কোতয়ালী থানার উলটগাঁও ও পাড়গাঁও গ্রামের ও জুয়ার আসর এলাকায় বিভিন্ন লোকজনের কথা বলে জানা গেছে, ওলটগাঁও ও পাড়গাঁও গ্রামের আত্রাই নদীর ধারে নির্জন এলাকায় দীর্ঘদিন যাবত জুয়ার আসর বসে থাকে। ওই রাতে জুয়ার আসর বসলে আনুমানিক রাত সাড়ে ১০ অথবা ১১ টায় চিরিরবন্দর থানার পুলিশ আসরে অভিযান চালায় এবং সব টাকা কেড়ে নেয়। এসময় অনেকে পালিয়ে যায়, কেউ কেউ নদীতে ঝাঁপ দেয়।

স্থানীয় এক ব্যাক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ওই সময় রফিকুল মাষ্টার নিজের থানার এরিয়ার বাহিরে অন্য এলাকায় অভিযানের প্রতিবাদ করলে ওই দারোগা নিজের পিস্তল দিয়ে মূখে আঘাত করে তাকে ধাক্কা দিয়ে নদীতে ফেলে দিয়ে চলে যান। এসময় পিস্তলের গুলি পড়ে যাওয়ায় ওই পুলিশ কর্মকর্তা ফেরত এসে জুয়ার আসর পরিচালনাকারীদের সাথে সমঝোতা করে গুলি ফেরত নিয়ে যায়।

ওই মামলার বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা এস আই সেকেন্দার আলীর কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, এজাহার নামীয় আসামীদের ওই মামলায় হত্যার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। তারা শুধুমাত্র সাথে করে জুয়া খেলতে নিয়ে গিয়েছিল। পুলিশ জড়িত কিনা প্রশ্নের জবাবে নিশ্চুপ থাকেন। গত ৫ মার্চ/১৭ বাদীকে মামলার ফলাফল অবহিতকরণ নোটিশে তথ্যগত ভূলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, আমি যা পেয়েছি, সে অনুসারে চুড়ান্ত রিপোর্ট দিয়েছি, অন্যকোন তদন্ত সংস্থা তদন্ত করলে অন্যকিছু পেতে পারে।

রফিকুলের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ২০১৬ সালের ২৩ জুলাই শনিবার দিবাগত রাত ৮টায় পার্শ্ববর্তি এলাকার মাসুদ নামের এক ব্যক্তি রফিকুল ইসলামের মুঠোফোনে কল করে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। রাত অনেক  গভীর হলেও তিনি বাড়িতে ফিরে না আসায় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উৎকন্ঠার সৃষ্টি হয় এবং তাঁর ব্যবহৃত মুঠোফোনে কল করলে তা সুইচ অফ পাওয়া যায়। এতে তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দু:শ্চিন্তা বেড়ে যায়। তারা তাঁকে সারারাত বিভিন্ন জায়গায় অনেক খোঁজাখুজি করেও তাঁকে কোথাও খুঁজে না পেয়ে ২৪ জুলাই রবিবার চিরিরবন্দর থানা ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানান।

ঘটনার দেড় দিন পর ২৫ জুলাই সোমবার দুপুর ১টায় উপজেলার ভিয়াইল ইউনিয়নের তালপুকুর চকরামপুর নামক ঘাটে আত্রাই নদীতে একটি মরদেহ ভাসতে দেখে স্থানীয় লোকজন থানা পুলিশে খবর দেয়। এ সংবাদ জানতে পেরে থানা পুলিশ ও পরিবারের সদস্যরা সেখানে গিয়ে উপস্থিত হন এবং এটি রফিকুলের মরদেহ সনাক্ত করেন। ওই ঘাটের মাঝি এমদাদ হোসেন শার্টের কলার ধরে ওই মরদেহটি নদীর ওপরে তুলে আনেন।

এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী লায়লা আরজুমান্দ বাদী হয়ে চিরিরবন্দর থানায় ৩ জনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করলে পুলিশ মাসুদ নামে একজনকে আটক করে। ঘটনার ব্যাপারে আটককৃত মাসুদ জানান, ওই রাত্রে আব্দুলপুর গ্রামের আবু হোসেনের ছেলে নুরুল হক (৫০) আন্ধারমূহা গ্রামের হাইসোর ছেলে মহসিন (৪৯) ও আমি শিক্ষক রফিকুলকে মোবাইলে ডেকে নিয়ে সদর উপজেলার উলটগাঁও গ্রামে অটোটেম্পু যোগে জুয়া খেলতে নিয়ে যাই। গভীর রাতে জুয়ার আসরে পুলিশ অভিযান চালালে আমরা ৩ জন পাািলয়ে আসি।

স্থানীয় সুধীজন জানান, চিরিরবন্দর থানার পুলিশ নিজ এরিয়ার বাহিরে গিয়ে ওই ঘটনাটি ঘটিয়েছে। দোষী ও সন্দেহজনক কর্মকর্তার ওই রাতের মোবাইলের অবস্থান প্রযক্তির মাধ্যমে চিহ্নিত করলে প্রকৃত ঘটনা বের হবে। তারপর এজাহারভূক্ত আসামীদের গ্রেফতার না করে মামলার চুড়ান্ত রিপোর্ট দেয়ায় সকলের কাছে সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। তারা মামলাটির পুনঃ তদন্ত দাবী করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনান দাবী জানিয়েছেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য