মাহবুবুল হক খান, দিনাজপুর থেকেঃ দিনাজপুর জেলা শিক্ষা অফিসারের স্বজনপ্রীতি, স্বেচ্ছাচারি আচরনে ও অবহেলার কারনে বীরগঞ্জ উপজেলার ভোগনগর ইউনিয়নের কবিরাজহাট আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীরা গত পাঁচ মাস ধরে বেতন-ভাতা না পেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। চলতি বছরের জানুয়ারী মাস হতে মে মাস পর্যন্ত প্রতিমাসে ৪/৫ বার করে জেলা শিক্ষা অফিসারের নিকট ধরনা দিয়েও তাঁর দেখা পাচ্ছেন না তারা। আর শিক্ষা অফিসারের সাথে দেখা না হওয়ায় শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের সরকারী অংশের বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। ফলে এসব শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের সন্তান-সন্তুত নিয়ে পবিত্র মাহে রমযান শেষে ঈদুল ফিতর উদযাপন করতে পারবেন না।

রোববার (৪ জুন) দিনাজপুর জেলা শিক্ষা অফিসার মো. রফিকুল ইসলামের সাথে দেখা করতে আসলেও তাঁকে অফিসে পাওয়া যায়নি। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. জয়নুল আবেদীন, সহকারী শিক্ষক মোছাঃ মাসুদা খাতুন, মো. মহির উদ্দিন, মো. মনিরুজ্জামান, মো. মহিউদ্দিন, শ্রী পদ্মলোচন, মো. ইউসুফ আলী, মোছাঃ সাবরিনা আফরোজ, মো. মনোয়ার হোসেন, শ্রী রাম বাবু, লায়লা আফরিন জাহান, মো. রফিকুল ইসলাম, গোপাল চন্দ্র রায়সহ অন্যান্য শিক্ষক-কর্মচারীরা রোববার সারাদিন জেলা শিক্ষা অফিস প্রাঙ্গণে দাড়িয়ে থেকেও শিক্ষা অফিসারের সাক্ষাৎ পাননি। মোবাইলে তাঁর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন তারা। অবশেষে বিকেল ৪টায় তাদের বীরগঞ্জে ফিরে যেতে হয়েছে।

কবিরাজহাট আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানান, ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে অত্যন্ত সুনামের সাথে বিদ্যালয়টি পরিচালিত হয়ে আসছে। বিদ্যালয়টিতে বর্তমান ছাত্রী সংখ্যা ৬৩৪ জন। পাবলিক পরীক্ষায় প্রতিবারেই ভাল ফলাফল করে আসছে।

বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আরো জানান, গত ২০১৪ সালের ১ মার্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাসুদা বেগম ও ২০১৫ সালের ১৮ জুলাই বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. কামাল উদ্দিন চাকুরি হতে অবসর গ্রহণের পর যথা নিয়মে জৈষ্ঠ্যতার ভিতিত্তে অত্র বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. জয়নুল আবেদীনকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি দায়িত্ব পালনকালে অসুস্থতার কারণে এক মাস দিনাজপুর ডায়াবেটিস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় স্বেচ্ছায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব হতে অব্যাহতি দানের আবেদন করেন। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি বিধি মোতাবেক তাঁকে অব্যাহতি দিয়ে পরবর্তি জৈষ্ঠ্য শিক্ষক মাসুদা খাতুনকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব প্রদান করেন। একই সময়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগের জন্য পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী নির্বাচনী বোর্ডের সুপারিশক্রমে অত্র বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক গৌরী বালা অধিকারীকে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়।

গত ১৩-১২-২০১৫ তারিখ গৌরী বালা অধিকারী সহকারী শিক্ষকের পদ হতে ইস্তফা দিয়ে গত ১৪-১২-২০১৫ তারিখে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু গৌরী বালা অধিকারী সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান ও এমপিওভুক্ত হওয়ার পূর্বেই বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিসহ বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের সাথে তাঁর শিষ্টাচার ও শৃঙ্খলা বহির্তূত আচরণের কারণে বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট হয়। তাঁকে বারবার সতর্ক করার পরও সংশোধন না হওয়ায় বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি শিক্ষার সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে অসদাচনের কারণে গৌরী বালা অধিকারীকে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ হতে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেন। তিনি বরখাস্ত হওয়ার পর হীনস্বার্থে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডসহ শিক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করে বিদ্যালয়ের পরিবেশকে অশান্ত করে তোলেন।

এরই মধ্যে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির মেয়াদ শেষ হলে পরবর্তি মেয়াদে কমিটি গঠনে ব্যর্থ হলে দিনাজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মনোরঞ্জশীল গোপালের পরামর্শ ও সুপারিশক্রমে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. জয়নুল আবেদীনকে পুনরায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব প্রদান করেন। একই সাথে বীরগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে সভাপতি মনোনয়নের শর্তে এডহক কমিটি গঠনের অনুমতি প্রদান করেন। কিন্তু সংসদ সদস্যের সুপারিশকে অবজ্ঞা ও শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের আদেশকে অমান্য করে গৌরী বালা অধিকারী জেলা শিক্ষা অফিসারের শরনাপন্ন হন। এডহক কমিটি বিধি মোতাবেক শিক্ষক প্রতিনিধি মনোনয়নের জন্য সর্বাধিক শিক্ষকের নির্বাচনের ভিত্তিতে শিক্ষক প্রতিনিধি মনোনয়নের তালিকা জেলা শিক্ষা অফিসারের দপ্তরে পাঠানো হলে জেলা শিক্ষা অফিসার স্বেচ্ছারিতা ও স্বজনপ্রীতির কারণে শিক্ষক প্রতিনিধি মনোনয়ন বাধাগ্রস্থ করেন। কমিটি গঠন না হওয়ার কারণে চলতি বছরের জানুয়ারী মাস হতে মে মাস পর্যন্ত পাঁচ মাস ধরে অত্র বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীরা বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। ফলে তারা সন্তান-সন্ততি নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

অবিলম্বে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা উত্তোলনের জন্য সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে এডহক কমিটি গঠন ও অনুমোদনের জন্য শিক্ষক-কর্মচারীরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য