বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমযোনের সর্ববৃহৎ রেল জংশনের নাম দিনাজপুরের পার্বতীপুর। ১৩৭ বছর আগে নির্মিত এস্টেশনটির নাম সমগ্র ভারতবর্ষ ছাড়িয়ে ব্রিটেন পর্যন্ত পৌছেছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পরে দীর্ঘ ৪৬ বছরে বারংবার স্টেশনটির আধুনিকায়নের দাবী করা হলেও বরাবর তা উপেক্ষিত থেকেছে। স্টেশনটি দ্রুত আধুনিকায়ন করে যাত্রী সেবারমান উন্নীত করতে পারলে এস্টেশনের বার্ষিক আয় বর্তমানের চেয়ে দিগুন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে এখানে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা মনে করেন।

দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি, মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনি, ২৫০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, পার্বতীপুর উত্তর-পশ্চিম মৎস্য সমপ্রসারণ প্রকল্প, রেলওয়ে কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানা (কেলোকা), পার্বতীপুর রেলহেড অয়েল ডিপো, রেলওয়ে ডিজেল কারখানা, পার্বতীপুর বীর উত্তম শহীদ মাহবুব সেনানিবাস ও বিদেশী মিশনারী দ্বারা পরিচালিত ল্যাম্ব হাসপাতালের কারণে দেশি বিদেশি যাত্রীদের গমনাগমনে জংশনটির গুরুত্ব বেড়ে গেছে বহুগুণ। কিন্তু ৪৬ বছরেও যাত্রী সেবারমান উন্নীত হয়নি। রেলের তুলনায় বাস ভাড়া দেড় থেকে দুইগুন বেশি হওয়ায় ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বেশী থাকায় প্রতি মাসে রেলওয়েতে যাত্রী সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে বাড়ছে রেলের রাজস্ব আয়ের পরিমাণও। অথচ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলীয় যোনের প্রাচীনতম ও দেশের সর্ববৃহৎ ৪ লাইনের এজংশন স্টেশনটি আজ নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত। স্বাধীনতার পরে এরেল স্টেশনে আধুনিকতার কোন ছোঁয়া না লাগায় সমস্যাগুলো দিনেরপর দিন বেড়ে চলেছে বলে সংশ্লিষ্টজনেরা মনে করেন।

রেল সূত্রে জানা যায়, ১৩ হাজার ৯৪২ বর্গফুট আয়তনের এই রেলওয়ে জংশনটি স্থাপিত হয় ১৮৭৯ সালে। বর্তমানে আন্তঃনগর ট্রেনসহ প্রতিদিন ৫২টি যাত্রীবাহী ট্রেন ঢাকা, চিলাহাটি, পঞ্চগড়, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, লালমনিরহাট, বুড়িমারী, বগুড়া ও সান্তাহার এবং কাউনিয়া কুড়িগ্রাম হয়ে চিলমারী (রমনাবাজার) যাতায়াত করে। প্রতি বছর এ স্টেশন হয়ে প্রায় ৪০ লাখ ও প্রতিদিন প্রায় ৩০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। তবে ইঞ্জিন, যাত্রীবাহী কোচ, লোকোমোটিভ মাষ্টার ও গার্ডসহ অন্যান্য জনবল স্বল্পতার কারণে ২৪টি ট্রেন দীর্ঘদিন যাবত বন্ধ রয়েছে।

ব্রডগেজ, মিটারগেজ ও ডুয়েলগেজ রেললাইন মিলে জংশনে মোট ৫টি প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। প্ল্যাটফর্ম গুলো নিচু ও খানা-খন্দের কারণে নিয়মিত যাত্রীরদের ট্রেনে ওঠানামা করতে অবর্ণনীয় কষ্টের শিকার হতে হয়। তবে সম্প্রতি জোড়াতালি দিয়ে প্ল্যাটফর্মের কিছু স্থানে সংস্কার কাজ করা হয়েছে। ৪ ও ৫ নং প্ল্যাটফর্মের আংশিক স্থান উঁচু করা হয়েছে ডেমু ট্রেনের যাত্রীদের ওঠানামার জন্য। অবশিষ্ট অংশে যাত্রীদের ওঠানামা করতে হয় রীতিমত ঝক্কি ঝামেলা নিয়ে। ওঠানামায় যেকোন মূহুর্তে দূঘর্টনার আশঙ্কা করেন যাত্রীরা। অপরদিকে, প্লাটফরম উঁচু করা অংশে পুরোটাই যাত্রীসেড নির্মান না করায় যাত্রী ভোগান্তি রয়েই গেছে। স্টেশনে একটি আধুনিক সুইচ কেবিন নির্মান করা হলেও অন্যত্র আর কোথাও আধুনিকতার কোনো ছোঁয়া লাগেনি। ১নং প্লাটফর্মে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর ভিন্ন ভিন্ন বিশ্রামাগার থাকলেও দেখা যায়, শুধুমাত্র দ্বিতীয় শ্রেনীর মহিলা বিশ্রামাগারটি খোলা থাকে। সেখানে মহিলা-পুরুষ একত্রে অবস্থান করায় মহিলারা অস্বস্তি বোধ করে। এর কারণ হিসেবে জানা যায়, ওয়েটিং রমে বেয়ারা ও আয়ার ৪টি পদে লোক থাকার কথা থাকলেও আছে শূধু একজন বেয়ারা। ৩টি পদ শুণ্য দীর্ঘদিন।

৩,৪ ও ৫ প্ল্যাটফর্মের কোনটিতে পর্যাপ্ত যাত্রী ছাউনি নেই। জংশনের একমাত্র ওভার ব্রিজটির অবস্থাও জরাজীর্ণ। ওভার ব্রিজে কোন ছাউনি না থাকায় রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে যাত্রীদের ওভারব্রিজ দিয়ে চলাচল করতে হয়। প্ল্যাটফর্মগুলোতে পানীয় জলের সুব্যবস্থা না থাকায় যাত্রীসাধারণকে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। জংশনের বিভিন্ন ভবনের অবস্থাও অত্যান্ত নাজুক। স্টেশন মাস্টার, টিকিট কাউন্টার, যাত্রীদের বিশ্রামাগারসহ বিভিন্ন কক্ষের দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ে ও ছাঁদ চুয়ে পানি পড়ার কারণে বছর তিনেক আগে প্রায় এক কোটি টাকা ব্যায়ে পূর্বের ছাঁদ ভেঙ্গে নতুন করে ঢালাই করা হয়। কিন্তু অবস্থার কোন হেরফের হয়নি। বর্ষা-বৃষ্টিতে এখনও ছাঁদ চুয়ে পানি পড়ছে।

এত বড় একটি রেলওয়ে জংশনে অনুসন্ধান বা তথ্য কেন্দ্র না থাকায় যাত্রী সাধারণ বেকায়দায় পড়েন। প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক বাতির অভাবে সন্ধ্যার পর অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে রেলওয়ে দক্ষিণ ইয়ার্ড এলাকা। এই ইয়ার্ডে সার্বক্ষণিক পড়ে থাকে কোটি কোটি টাকা মূল্যের রেলওয়ে যাত্রীবাহী কোচ ও ওয়াগন। পর্যাপ্ত বাতি-আলো না থাকার ফলে মাদকসেবী, চোরাকারবারি, ছিনতাইকারী ও ভাসমান পতিতাদের দখলে চলে যায় পুরো রেল ইয়ার্ড। সীমানা প্রাচীর না থাকায় ছিনতাইকারীরা অপরাধ সংঘটিত করে নির্বিঘেœ পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় স্টেশন থেকে। জংশনের ৫নং প্ল্যাটফর্মের পাশ দিয়ে জংশন সংলগ্ন শহরকে আলাদা করতে একসময় লোহার তার কাঁটা দিয়ে পুরো স্টেশন এলাকা ঘিরে রাখা হয়েছিল। এতে অপরাধী ও বিনা টিকিটের যাত্রীরা সহজে স্টেশন থেকে পালিয়ে যেতে পারত না। শুধু তাই নয়, স্টেশনে প্রবেশ করতে হলেও যেকোন লোককে টিকিট কাটতে হতো অতীতে।

এব্যবস্থা বহাল না থাকায় চোর, গুন্ডা, মাস্তান, ছিনতাইকারী ও মাদকসেবীদের অবাধ যাতায়াত রযেছে স্টেশনে। এছাড়া, আন্তঃনগর একতা, দ্রুতযান, নীলসাগর, খুলনা, রাজশাহী ও ঢাকা আসা মেইল, লোকাল ও আন্তঃনগর ট্রেনগুলো এখন চোরাচালানিদের দখলে চলে গেছে। অসাধু কিছু রেলওয়ে পুলিশ ও রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যক্ষ মদদে ট্রেনে চোরাচালানের মালামাল অবাধে নিয়ে আসছে। চোরাচালানিদের কাজের প্রতিবাদ করতে গিয়ে যাত্রীদের নাজেহাল হতে হয়। ফলে কাক্সিক্ষত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন চার লাইনের এ জংশন হয়ে যাওয়া বিভিন্ন রুটের হাজার হাজার যাত্রী। ফলে যাত্রী সাধারণের মধ্যে চরম ক্ষোভ আর হতাশা বিরাজ করছে।

এদিকে, রেল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে দীর্ঘদিনে তারকাটাগুলো চুরি হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে পার্বতীপুর রেল স্টেশন ও শহর একাকার হয়ে গেছে। বৃহৎ এই রেলওয়ে জংশনটিতে বিভিন্ন আন্তঃনগর ট্রেনের বিশেষ করে পার্বতীপুর থেকে ঢাকার আসন সংখ্যা কম হওয়ায় ঢাকাগামী যাত্রীসাধারণকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এখানে যে পরিমাণ আসনের প্রয়োজন তার চেয়ে অর্ধেক আসন বরাদ্দ রয়েছে। রেলওয়ে জংশন এলাকায় প্রায় প্রতিটি লাইনেই ঘাস থাকায় গবাদি পশু অবাধে বিচরণ করে। একারণে রেল লাইনে অনেক গবাদি পশু কাটাপড়ার ঘটনাও ঘটেছে এর আগে। নিয়মিত পরিস্কার পরিচছন্নতার অভাবে স্টেশনটির বিভিন্ন স্থান নোংরা আবর্জনা স্তুপে ভরে থাকে। ছিন্নমূল অনেক মানুষ প্ল্যাটফর্মে ও আশপাশে এলাকায় বসত গড়ে তোলায় এগুলো অপরাধের আখড়ায় পরিনত হয়েছে। জংশনের পণ্যবাহী ট্রেনের মালামাল ওজনের জন্য একমাত্র মেশিনটি থাকলেও সেটি দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে পড়ে আছে। জংশনে চলাচলকারী ট্রলি ভ্যানগুলোতে রাবারের চাকা না থাকায় শব্দ দূষন হয় প্রতিনিয়ত। রেলওয়ে জংশনের পূর্ব পাশ ঘিরে গড়ে উঠেছে কয়েকটি চোলাই মদের অবৈধ দোকান। ফলে জংশনের পরিবেশ নষ্ট করছে মাদকসেবীরা।

এব্যাপারে পার্বতীপুর রেল স্টেশন মাষ্টার শোভন রায়ের সাথে যোগাযোগ করা হলে বলেন, জংশনের বিভিন্ন ভবনের অবস্থা অত্যান্ত নাজুক। প্ল্যাটফর্ম গুলোতে পানীয় জলের সুব্যবস্থা না থাকা, সীমানা প্রাচীর না থাকা ও প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক বাতির অভাবে সন্ধ্যার পর অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে থাকে রেল এলাকা। তিনি আরো বলেন, যাত্রীদের বিশ্রামাগারসহ বিভিন্ন কক্ষ সংস্কার করা হলেও বৃষ্টি-বর্ষার কারণে এসব কক্ষের ছাঁদ চুঁয়ে পানি পড়ে। প্ল্যাটফর্মে প্রয়োজনীয় যাত্রীসেড নেই, রেলওয়ে জংশনে অনুসন্ধান বা তথ্য কেন্দ্র না থাকার কথা তিনি স্বীকার করেন। এ জংশনটি দিয়ে বর্তমানে দেশী বিদেশী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের যাতায়াত বেড়েছে। জংশনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, যাত্রী সেবার মান বৃদ্ধি, ভবনগুলো আধুনিকায়ন করে ট্রেনে চোরাচালান বন্ধ করতে পারলে সাধারণ মানুষ আরো ট্রেনমুখী হবে। বর্তমানে এ জংশন স্টেশন থেকে প্রতি বছর ৭ কোটিরও বেশি টাকা রাজস্ব আয় হচ্ছে। স্টেশন আধুনিকায়ন করে যাত্রীসেবার মান বৃদ্ধি করতে পারলে এ আয় আরো বৃদ্ধি পাবে তিনি উল্লেখ করেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য