যৌবনেই পর পর দু’বার সংসার ভেঙ্গে যাবার পর মানষিক ভারসাম্য হারিয়ে আব্দুল জলিল মাস্টার টানা ২৫ বছর ধরে নিজেকে চার দেয়ালের মাঝে স্বেচ্ছায় বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। সমাজ আর সামাজিকতা থেকে নিজেকে পৃথক করে লুকিয়েই কেটে গেছে তার জীবনের এতগুলো বছর ! গৃহ পালিত পশু-পাখিরও মানুষ যতœ নেয়,পরিচর্যা করে। মানুষ হয়ে সেই পরিচর্যাটুকুও ভাগ্যে জোটেনি তার। তিনি যে ঘরে বসবাস করেন। সে ঘরেই নাওয়া-খাওয়সহ প্রাকৃতিক সব কাজেই সারতে হয় সেখানে।

স্যাঁত স্যাঁতে ঘরের মেঝেতে অসংখ্য ইঁদুরের গর্ত আর মাটিতে পুরো মেঝে ভরপুর। সারা ঘর-বারান্দায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে মানুষের বিষ্ঠা। ঘরের এককোণে পুরনো ১টি ভাঙ্গা চৌকি। পাশেই ভাঙ্গাঁ টেবিল। যার উপর অপরিস্কার থালা, বাটি ও গ্লাস। সকাল থেকে শেষ বেলা পর্যন্ত খাবার যে পেটে যায়নি তার দেখে অনুমান করা যায়। চৌকির ওপর বিছানো তোষক এবং পরিধেয় কাপড়গুলো মধ্যে পুরনো লুঙ্গি, ছেঁড়া পাঞ্জাবী ও পাতলা কম্বল। কতদিন ধরে যে এগুলো পরিস্কার করা হয় না,তা দেখেই বোঝা যায়।

চারপাশেই বিদ্যুতের আলোর ঝলকানি থাকলেও কোন আলো নেই ু তার ঘরটিতে। বৈদ্যুতিক আলো তো নয়ই,নেই কেরোসিন কুপির ব্যবস্থাও। জানালা, দরজা ভাঙ্গা ঘরটি যেন তেলাপোকা, ইঁদুর, কেঁচো ছুঁচো চামচিকা আর নানা সরীসৃপের অভয়াশ্রম। ঝড়-বৃষ্টি, শীত, গরম উপেক্ষা করে সেই অন্ধকার মাটির ঘরেই বসবাস করছেন পীরগঞ্জ উপজেলার চৈত্রকোল ইউনিয়নের ঝাড়ামবাড়ী গ্রামের মৃত অমির উদ্দিনের পুত্র মানষিক ভারসাম্যহীন আব্দুল জলিল মাষ্টার (৭২)।

এলাকাবাসীর কাছে তিনি জলিল পাগলা নামেই পরিচিত। খেয়ে না খেয়ে গত ২৫ বছর কেটে গেছে তার সেই অন্ধকার মাটির ঘরেই। অথচ এতদিনও অসহায় এ শিক্ষকের কেউ কোন খোঁজ নেয়নি। প্রতিবেশী নয়া মিয়া মেম্বার জানান, ঘর আর বারেন্দা ছাড়া কখনো কোথাও বের হন না তিনি। কারো সঙ্গে কথা বলাতো দুরের কথা, কোন মানুষের আনা গোনা পেলেই ঘরের দরজা লাগিয়ে নিজকে লুকিয়ে রাখেন। কি যেন এক অজানা আতংক তাকে সারাক্ষণ তাড়া করে।

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করতে গিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ঘা ও পঁচন ধরেছে। সেই পচনের কোন চিকিৎসার উদ্যোগও নেই। একজন মানুষ গড়ার কারিগর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওই শিক্ষকের করুণ এই পরিণতি অনেক কষ্টের। প্রতিদিন একবেলা খাবার দিত তার খালাত ভাই আব্দুল খালেক। তিনি যদি জরুরী কাজে বাহিরে কোথাও যান, সেই দিন ওই একবেলা খাবারও তার ভাগ্যে আর জোটে না। না খেয়ে থাকলেও তিনি কখনো কারো কাছে খাবার চান না, এমনকি ঘর থেকে বেরও হন না।

আব্দুল জলিল মাষ্টার দুই ভাই চার বোনের মধ্যে তৃতীয়। বড়ভাই আজিজার রহমান ১৯৭১ সালে পাক-হানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ হন। বড়বোন সাফিয়া বেগম ও সাবেরন নেছা অনেক আগে মারা গেছেন। বেঁচে আছেন ছালেহা বেগম ও ফেরদৌসী বেগম। ভাগ্নে-ভাগ্নি ও বোনেরা মাঝে মধ্যেই তাকে দেখতে আসেন। কিন্তু জলিল মাষ্টার তাদের কোনভাবেই সাড়া দেন না। এমনকি কোন কাপড়-চোপড় বা খাবার নিয়ে এলেও তা ছুড়ে ফেলেন তিনি।

পৈত্রিক সূত্রে ও তার ক্রয়কৃত প্রায় ৭ বিঘা ফসলি জমি বর্তমানে তার ভাগ্নে ও খালাত ভাই চাষাবাদ করেন। যার বিনিময়ে ভাগ্নেরা কোন কিছু না দিলেও খালাত ভাই আব্দুল খালেক বেঁচে থাকার জন্য আব্দুল জলিল মাষ্টারকে শুধুমাত্র একবেলা খাবারটুকু দিয়ে থাকেন। আব্দুল জলিল  ১৯৭২ সালে রংপুর কারমাইকেল স্কুল এন্ড কলেজ থেকে স্নাতক পাশ করেন। ঐ সময় আশপাশের দু’চার গ্রামের মধ্যে তিনিই একমাত্র ম্নাতক ডিগ্রীধারী।

১৯৭৩ সালে উপজেলার চৈত্রকোল ইউনিয়নের পালগড় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে ৫ বছর চাকুরী করার পর বাড়ির পার্শ্বে খাসতালুক সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। এর আগে আব্দুল জলিল মাষ্টার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হযেছিলেন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই সে সংসার ভেঙ্গে যায়। ২য় বিয়ে করেও স্থায়ী হয়নি তার সংসার।

ফলে চির কুমারের মতো  স্ত্রী সন্তানহীন জীবন তার। যে কারনেই তিনি ধীরে ধীরে মানষিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন এবং চার দেয়াল বেষ্টিত অন্ধকার মাটির ঘরে অমানবিক জীবন কাটাতে থাকেন। এ ভাবেই চলে গেছে যার জীবন যৌবনের এতগুলো বছর ! যার খবর কেউ রাখে না ?

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য