ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার জবাইয়ের উদ্দেশ্যে গবাদিপশু কেনাবেচার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার প্রতিবাদে কেরালায় ‘বিফ ফেস্টিভ্যাল’-পালন করল বামপন্থি ছাত্র-যুব সংগঠন।

শনিবার বামশাসিত কেরালায় কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় ‘গরুর গোশত ভক্ষণ উৎসব’–এর আয়োজন করে সিপিএমের ছাত্র সংগঠন এসএফআই ও যুব সংগঠন ডিওয়াইএফআই।

‘রান্নাঘরে ফ্যাসিবাদ চলবে না’ শ্লোগান তুলে রাজ্যের কমপক্ষে ২০০ স্থানে ওই উৎসবের আয়োজন করা হয়। তিরুবনন্তাপুরমে রাজ্য সচিবালয়ের বাইরে বিক্ষোভকারীরা সড়কের পাশে গরুর গোশত রান্না করে তা লোকজনের মধ্যে বিতরণ করেন।

কোল্লাম জেলায় কংগ্রেস দল ‘বিফ ফেস্টিভ্যাল’ আয়োজন করে। কোচিতে কেরালার পর্যটন মন্ত্রী কাডাকাম্পালি সুরেন্দ্রন ওই উৎসবে যোগ দেন। ইডুক্কি জেলায় মহিষের মাথা নিয়ে প্রতিবাদ মিছিলের আয়োজন করা হয়। আগামীকাল (সোমবার) কেরালায় ‘কালা দিবস’ পালনের ডাক দিয়েছে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ জোট।

কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন বলেন, ‘দেশজুড়ে মানুষকে হত্যার অভিযান চলছে, তখন পশু জবাই বন্ধ করে লাখ লাখ মানুষের জীবিকার ক্ষতি করা হচ্ছে।’

পিনারাই বিজয়ন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে খোলা চিঠিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘আজ সরকার গরুর গোশত খেতে নিষেধ করছে। কাল মাছ খাওয়া নিয়েও আপত্তি তুলবে। মানুষ কী খাবে আর কী খাবে না, তা কী সরকার ঠিক করে দেবে? নিজের মর্জি তো খুব খাটাচ্ছেন, কিন্তু এতে কত মানুষ কাজ হারাতে বসেছেন তা কী জানেন? এ রাজ্যে এ সব চলবে না। প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা নেব।’

তামিলনাড়ু রাজ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শনিবার হাজার হাজার মানুষ পথে নামেন। বিভিন্ন জায়গায় প্রধানমন্ত্রী মোদির কুশপুতুল পোড়ানো হয়।

ডিএমকে নেতা এমকে স্ট্যালিন বলেন, ‘ভারত একটি যুক্তরাষ্ট্র। মানুষের ওপর জোর করে নিজেদের ধ্যান-ধারণা না চাপিয়ে দিলেই পারে বিজেপি সরকার। এতে দেশের বহুত্বের বৈশিষ্ট্যে আঘাত হানা হয়। এখনই ওই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হোক। সরকার মানুষের খাদ্য তালিকা নির্ধারণ করে দিতে পারে না।’

পুদুচেরির মুখ্যমন্ত্রী ভি নারায়ণস্বামী কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, “মানুষের খাদ্যাভ্যাসের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার কোনও অধিকার নেই কেন্দ্রীয় সরকারের। ওই সিদ্ধান্ত ‘স্বৈরতান্ত্রিক’। সরকার মানুষের পছন্দমতো খাবার অধিকার কেড়ে নিচ্ছে।”

ভারতের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এ কে অ্যান্টনির মন্তব্য, কেন্দ্রীয় সরকারের ওই নির্দেশিকা ছিঁড়ে ফেলে দেওয়া উচিত। সিপিআই কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের নিন্দা করে বলেছে, ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ তৈরির লক্ষ্য নিয়েই ওই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

সিপিএমের পলিটব্যুরো বলেছে, দেশে খাদ্যাভ্যাসের বিধি চাপিয়ে দিতে চাইছে মোদি সরকার। সেই লক্ষ্যে গোশতের জন্য কোনো পশু বাজার থেকে কেনা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সাম্প্রদায়িক, বিভেদকামী এক কর্মসূচিকে আইনের খোলস পরানো হচ্ছে। কৃষকরা এমনিতেই দুর্দশাগ্রস্ত, আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন তারা। তার উপরে এই অতিরিক্ত আঘাত আনছে কেন্দ্রীয় সরকার। চর্ম শিল্প, গোশত রপ্তানি শিল্পেও লাখ লাখ মানুষের জীবিকা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূলের মহাসচিব ও রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ওই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিরোধী। কেন্দ্রীয় সরকার তাদের সঙ্গে এ নিয়ে কোনো আলোচনা করেনি। তাদের অবস্থান স্পষ্ট। কেন্দ্রীয় সরকার নির্দেশিকা পাঠালে তারা পরবর্তী পদক্ষেপ করবেন।

ভারতের কেন্দ্রীয় নারী ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রী মানেকা গান্ধী সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, গত ১৫ বছর ধরে কসাইরা কৃষক সেজে গবাদি পশু কিনে নিয়ে গিয়ে তাদের জবাই করছে। তাই কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্ত যথার্থ।

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী বেঙ্কাইয়া নাইডু বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই ওই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ওই পদক্ষেপের সঙ্গে ধর্মের যোগ খোঁজা উচিত নয়।

কেন্দ্রীয় সরকার এক নির্দেশে বলেছে, আন্তর্জাতিক সীমান্তের ৫০ কিলোমিটার এবং রাজ্য সীমান্তের ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে পশুবাজার করা যাবে না। রাজ্যের বাইরে পশু নিয়ে যেতে গেলে রাজ্য সরকারি কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুমোদন লাগবে। একবার কোনো পশু কেনার পরে ৬ মাসের মধ্যে তা বিক্রি করা যাবে না। পশু কেনার পরে রাজস্বদপ্তর, প্রাণীপালন দপ্তর-সহ কমপক্ষে তিনটি জায়গা থেকে শংসাপত্র নিতে হবে।

এছাড়া পশু বিক্রি না করে মালিক যদি তাকে নিজের কাছে না রেখে কোনো আশ্রয়ে রাখতে চান তাহলে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় তাকেই বহন করতে হবে। তিনি ব্যয়ভার বহন করতে অক্ষম হলে তার জমির বকেয়া হিসাবে মূল্য কেটে নেয়া হবে। ষাঁড়, বলদ, মহিষ, বকনা বাছুর, বাছুরহীন গাভী, উট ওই নির্দেশিকার আওতায় পড়েছে। এরপরেই বিভিন্ন রাজ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য