যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারে জনপ্রিয় এক মার্কিন পপ তারকার কনসার্টে সোমবারের ভয়াবহ আত্মঘাতী বোমা হামলায় ২২ জন নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে একজন আট বছর বয়সী মেয়ে, কিশোর-কিশোরী ও বাচ্চাদের বাড়িতে নিতে আসা বাবা-মা রয়েছেন। পুলিশ এই ঘটনায় নিহতদের সকলের পরিচয় জানতে পেরেছে। খবর এএফপি’র।

নিচে তাদের পরিচয় দেয়া হল: চোয়ে রাদারফোর্ড (১৭) ও লিয়াম কারি (১৯)। এরা ইংল্যান্ডের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় সাউথ শিল্ডসের বাসিন্দা। তাদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা খুবই ঘনিষ্ঠ ছিল। উভয় পরিবার এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘এরা দুজনে একসঙ্গে সময় কাটাতেই পছন্দ করত।’ বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ‘তারা নতুন নতুন স্থানে একসঙ্গে বেড়িয়েছে। তারা আজীবন একসঙ্গে থাকতে চেয়েছিল এবং এখন তারা একসঙ্গেই আছে।’ আট বছর বয়সী ফুটন্ত গোলাপের মতো সাফি রোজ রোউসোস। মেয়েটি ইংল্যান্ডের উত্তরপশ্চিমাঞ্চলীয় ল্যাঙ্কাশায়ারের লেইল্যান্ডের বাসিন্দা। শিশুটি এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট।

রোজ তার মা ও বোনের সঙ্গে কনসার্টে গিয়েছিল। বন্ধুরা জানান, তাদের দুজনকেই হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। টার্লেটন কমিউনিটি প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ক্রিস উপটন রোজকে ‘একটি সুন্দর ছোট্ট মেয়ে’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘সবাই তাকে ভালবাসত। সে তার মমতা ও আন্তরিকতার জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।’ ম্যানচেস্টারের কাছে স্টোকপোর্টের বাসিন্দা জনসংযোগ কর্মকর্তা মার্টিন হেট ‘কাম ডাইন উইথ মি’ ও ‘ট্যাটু ফিক্সার্স’ এর মতো টিভি শোতে উপস্থিত হতেন। বোমা হামলায় তিনি মারা গেছেন বলে তার ভাই টুইটারে নিশ্চিত করে বলেছেন, ‘আমাদের হৃদয় ভেঙ্গে গেছে। তার মৃত্যুতে আমরা অত্যন্ত ব্যথিত।’

তার বন্ধু রাসেল হেইওয়ার্ড বলেন, ‘আমাদের চমৎকার, তারকা ও সুদর্শন মার্টিন বেঁচে নেই।’ তিনি আরো বলেন, ‘ও যেভাবে সব সময় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকত, তার মৃত্যুও ঠিক সেভাবেই হল।’ এই ঘটনায় মারা যাওয়া মিশেল কিস তার স্বামী টনির একজন প্রেমময়ী স্ত্রী এবং ডিলান, এলিওট ও মিলি’র ¯েœহময়ী মা ছিলেন। তার পরিবারের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘তার পরিবারই তার জীবন এবং তার এই মৃত্যু আমাদের জন্য একটি বড় ধরনের বিপর্যয়। তাদের আমাদের ও তার প্রিয়জনকের কাছ থেকে অকল্পনীয়ভাবে কেড়ে নেয়া হয়েছে।’ অলিভিয়া ক্যাম্পবেল (১৫) তার বন্ধু অ্যাডামের সঙ্গে কনসার্টটি উপভোগ করছিল। বিস্ফোরণে সে নিহত হয়। অ্যাডাম এই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচেছ। অলিভিয়ার মা ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আমরা প্রাণ প্রিয় চমৎকার মেয়েটিকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিল।’ তিনি তার মেয়ের উদ্দেশ্যে আরো লিখেন, ‘যাও দেবদূতদের সঙ্গে গান গাও এবং সুখে থাক। তোমার মা তোমাকে অনেক ভালবাসে।’

অলিভিয়ার নানী বলেন, বিস্ফোরণের আগে মা-মেয়ে দুই ঘন্টা টেলিফোনে কথা বলে। জর্জিয়ানা ক্যালেন্ডার মর্মান্তিক এই হামলায় মারা গেছে। ল্যাঙ্কাশায়ারে তার স্কুল রানশ’ কলেজ তার মৃত্যুর সত্যতা নিশ্চিত করেছে। এই তরুণীর বয়স ১৮ বছর বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার সাবেক স্কুল বিশোপ র’স্টোন একাডেমি তার জন্য প্রার্থনা ও তার জীবন আলোচনা করার জন্য শিক্ষার্থীদের জড়ো করেছে। ডেইলি মিরর পত্রিকা জানায়, অ্যালিসন হোওয়ে (৪৫) ও লিসা লিস (৪৭) কনসার্টে বিস্ফোরণে মারা গেছেন। এ সময় তারা সেখানে তাদের মেয়েদের বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তারা ম্যানচেস্টারের বাইরে ওল্ডহ্যাম এর বাসিন্দা। তাদের দুই মেয়ের বয়সই ১৫ বছর। তারা নিরাপদে রয়েছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। হোয়ের সৎ ছেলে জর্ডান হোয়ে তার মৃত্যুর সত্যতা নিশ্চিত করে ফেসবুকে লিখেন, ‘তারা আমাদের কাছ থেকে একজন যতœবান সুন্দরী মাকে কেড়ে নিল।’ পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইটোল্ড ওয়াসজিদোওস্কি বলেন, ব্রিটেনে বসবাসরত এক পোলিশ দম্পতি তাদের মেয়েদের বাড়িতে নিতে এসে মারা যায়। পোলিশ গণমাধ্যম জানিয়েছে, তাদের নাম অ্যাঞ্জেলিকা ও মার্সিন ক্লিস। ওয়াসজিকোওস্কি বলেন, এই বিস্ফোরণে তাদের মেয়েরা অক্ষত রয়েছে। ২৬ বছর বয়সী ল্যাঙ্কাশায়ারের বাসিন্দা জন আটকিনসন এই ঘটনায় নিহত হয়েছেন।

জনের বান্ধবী হাইলেই তুর্ক তার পরিবারের জন্য অনলাইন ফান্ড আয়োজন করেন। হাইলেই বলেন, ‘জন একজন প্রকৃত ভদ্রলোক ছিল।’ ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলীয় শেফিল্ডের বাসিন্দা কেলি বিউস্টারের বাবা ইয়ান ইউস্লো তার মৃত্যুর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, ১১ বছরের ভাতিজিকে বাঁচাতে তাকে জড়িয়ে ধরে নিজেকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে জীবন দেন ব্রিউস্টার। নেল জোন্স (১৪) ঘটনাস্থলেই মারা যান। সে কাছেই চেশায়ারের হোলমেস চ্যাপেল স্কুলে পড়ত। তার স্কুল তার মৃত্যুর সত্যতা নিশ্চিত করেছে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ডেনিস অফিভার বলেন, কিশোরিটি ‘অত্যন্ত মেধাবী ও জনপ্রিয় ছাত্রী ছিল।’ ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের লিডসের বাসিন্দা সোরেল লেকজকোউস্কি (১৪) বিস্ফোরণে মারা গেছে। সে অ্যালার্টন হাই স্কুলে পড়ত। স্কুলের প্রধান শিক্ষক তার বাবা-মার কাছে এক চিঠিতে লিখেন, ‘সোরেল ‘স্কুল কমিউনিটির একজন উচ্ছ্বল শিক্ষার্থী ছিল।’ বিস্ফোরণে তার মা সামান্থা গুরুতর আহত হয়েছেন। তার শরীর থেকে বোমার টুকরো অপসারণ করতে ১৫ ঘন্টাব্যাপী অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। একটি স্কুলের অভ্যর্থনাকারী জেন টুয়েডেল (৫১) এই বিস্ফোরণে মারা গেছেন। তিনি তার এক বন্ধুর মেয়েকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য সেখানে অপেক্ষা করছিলেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য