আজিজুল ইসলাম বারী,লালমনিরহাট থেকে: প্রতিনিয়ত ভ্যানে বোঝাই ধানের বস্তা নিয়ে চলতে হয়।  এক পা দিয়ে প্রাণপণে সে ভ্যান টেনে নিয়ে যান আমিনুর রহমান।  বয়স প্রায় ৩০ ছুঁই ছুঁই।   জন্ম থেকে তাঁর এক পা।  কিন্তু তাতে কী? আরেকটি পা তো সচল।  ওই পা দিয়েই চলছে জীবনের চাকা।  এক পায়ে চাপ পড়ায় শরীরের বাঁ-পাশে মাঝে মধ্যে তীব্র ব্যথা হয় ভ্যানচালক আমিনুর রহমানের।  কিন্তু সব সময় চিকিত্সা করানোর সামর্থ্য থাকে না।  তাই  নিজেই দোকান থেকে ওষুধ কিনে খেয়ে নেন।

তিনি বলেন, রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা বেশি হলে বা খানাখন্দে পড়লে তাঁকে বেশ সমস্যায় পড়তে হয়।  তখন নেমে লাফিয়ে লাফিয়ে টানতে হয় ভ্যান।  যেসব জায়গায় রাস্তা উঁচু-নিচু, সেখান দিয়ে এলাকায় মাল ও যাত্রী নিয়ে যেতে পারেন না।  মালামাল পরিবহনের করতে গিয়ে ভ্যানে মাল তোলার সময় অন্য মানুষ হাত না বাড়লে কিছুতেই মালামাল তুলতে পারেন না তিনি।  তখন দমে যেতে হয় তাঁকে।  কিন্তু কেউ না কেউ তাকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।  তখন আবার শুরু হয় সংগ্রাম।

আমিনুর প্রতিবেদকে আরো বলেন, জন্ম থেকে এক পা দিয়ে অযত্নে অবহেলায় বড় হয়ে উঠা এক যুবক আমিনুর রহমান।  অভাবের সংসারে লেখাপড়া করা হয়নি তার।  তাই বলে কি বসে থাকবে জীবন।  তিনি এক পা দিয়েই ভ্যান গাড়ী চালিয়ে জীবন যুদ্ধে নেমে পড়েছেন।  জীবন সংগ্রামী টগবগে এ যুবক উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের মহিষখোচা কচুমুরা গ্রামের আব্দুল লতিফের ছেলে।  জন্ম থেকে আমিনুরের বাম পায়ের হাঁটু থেকে নিচের অংশটি নেই।  প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নেওয়াটাই যেন ছিল তার মহাপাপ।  অভাবের সংসারে তার কোনদিন স্কুলে যাওয়া হয়নি।  জন্মের কিছুদিন পর তার বাবাকে হারান।  আর তার মা অন্যের বাসায় ঝিয়ের কাজ ও ভিক্ষাবৃত্তি করে তাকে বড় করে তোলেন। শারীরিকভাবে অক্ষম থাকায় আমিনুর ভ্যান গাড়ি চালাতে থাকেন।  তবে তার এক পা না থাকায় সহজেই কেউ তা ভ্যানে মালামাল বহন করতে চায় না।
অনেকটা জোর করেই তিনি ভারী জিনিসপত্র বহন করে থাকেন।

ভ্যান গাড়ি চালিয়ে প্রতিদিন একশ বিশ থেকে একশ পঞ্চাশ টাকা আয় হয়।  এ আয়েই এক বেলা খেয়ে না খেয়ে চলছে তার ৫ জনের সংসার।  আর এভাবেই দীর্ঘ ১৫টি বছর ধরে এ পেশায় জীবন-যাপন করে আসছেন।  বড় মেয়ে মিষ্টি বেগম (৯) ৩য় শ্রেণীর ছাত্রী আর ছোট মেয়ে বৃষ্টি (৬) প্রথম শ্রেণীর ছাত্রী।  সম্প্রতি উপজেলা পরিষদ চত্বরে কথা হয় আমিনুর ইসলামের সাথে।  তিনি জানান, নিজের ভিটে মাটি নেই।  সরকারী জায়গায় রাস্তার ধারে ছোট একটি টিনের চালায় তার পরিবারকে নিয়ে বসবাস।  অভাব যেন কোন ভাবেই তার পিছু ছাড়ছে না।  সরকারীভাবে তার প্রতিবন্ধী ভাতা রয়েছে।  প্রতি মাসে সেখান থেকে তিনশ টাকা পেয়ে থাকেন।  আর এ টাকা তিনি মেয়ে দুটোর লেখাপড়ার পেছনে ব্যয় করে থাকেন।  মাসহ ৫ জনের সংসার ভালই চলত এমনটাই দাবী তার।

তিনি সমাজের বিত্তবান লোকদের কাছে সহযোগিতার দাবী জানান।  মহিষখোচা এলাকার তার প্রতিবেশির কাছ থেকে জানতে চাইলে বলেন, আমিনুর এক পা নিয়ে সমাজের বোঝা হয়ে থাকতে চান না । প্রতিদিন ভ্যান গাড়ি চালিয়ে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে অভাবের সংসার।   আমিনুর এক পা দিয়েই দীর্ঘদিন যাবত ভ্যান গাড়ি চালিয়ে কষ্টে সংসার চালাচ্ছেন।  একটু সহযোগিতা পেলে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবেন বলে তিনি আশাবাদী।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য