ফ্রান্সের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ ‘বিভক্তি সৃষ্টিকারী শক্তির’ বিরুদ্ধে লড়াই করে জাতীয় ঐক্য গড়া ও ইউরোপকে সুরক্ষিত রাখার অঙ্গীকার করেছেন।

‘যেসব শক্তি ফ্রান্সকে বিভক্ত করে অবদমিত করে’ তার বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশের জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে ওঠার আশা প্রকাশ করেছেন নেপোলিয়ন-পরবর্তী যুগের তরুণ এ প্রেসিডেন্ট।

নির্বাচনের প্রাথমিক ফলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরই প্যারিসের ল্যুভর মিউজিয়ামের সামনের সমাবেশে বিভক্তির রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াই করা, জনগণের শঙ্কা দূর করে তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সবাইকে একতাবদ্ধ করার ঘোষণা দেন মাক্রোঁ।

রোববারের দ্বিতীয় দফা নির্বাচনে মাক্রোঁ পান ৬৬ দশমিক ১ শতাংশ এবং তার প্রতিপক্ষ লো পেন পান ৩৩ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট।

নির্বাচনে এ জয়ের পর ফ্রান্সে নতুন অধ্যায় রচনার আশ্বাস দিয়ে সমর্থকদেরকে মাক্রোঁ বলেন, তিনি দেশে বাম-ডান ধারার মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করতে চান। কট্টরপন্থার দিকে ভোটারদের ঝুঁকে পড়াও থামাতে চান তিনি।

মাক্রোঁ বলেন, তিনি জনগণের ক্ষোভ, হতাশা এবং উদ্বেগের বিষয়টি বোঝেন এবং তিনি মনে করেন এ সবের কারণেই ভোটাররা কট্টরপন্থী প্রার্থীকে ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ হয়েছে। এ হুজুগ তিনি থামাতে চান।

ওদিকে, বিভক্তি দূর করে ঐক্য গড়ার প্রশ্নে মাক্রোঁ বলেন, “আমি আপনাদের ক্ষোভ, উৎকণ্ঠা, শংসয়ের কথা শুনেছি। যেসব শক্তি ফ্রান্সকে বিভক্ত করে অবদমিত করতে চায়, আমি সেইসব শক্তির বিরুদ্ধে লড়ব। আমি জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা… এবং ইউরোপের সুরক্ষারও নিশ্চয়তা দেব।”

রোববার ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হিসাবে মাক্রোঁ শপথ নেবেন বলে জানিয়েছেন বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া অলন্দ।

সমর্থকদের উদ্দেশে বিজয়ী ভাষণে মাক্রোঁ বলেছেন, “ফ্রান্সের মানুষ আমাকে বিশ্বাস করে নির্বাচিত করেছে। এটি অনেক সম্মানের। আজ আপনারা জিতেছেন, ফ্রান্স জিতেছে। সবাই আমাদেরকে বলছিল এটি অসম্ভব। কিন্তু তারা ফ্রান্সকে জানে না “

ভাষণে তিনি আরও বলেন,  “আমরা কোনও কিছুতেই আমাদের সামর্থ্য, শক্তি কিংবা আন্তরিকতা  বিসর্জন দেব না।”

মাত্র এক বছর আগে সরকারি পদ ছেড়ে নিজের রাজনৈতিক দল ‘এন মার্চ’ বা ‘এগিয়ে যাও’ গঠন করেই বাজিমাত করেন মাক্রোঁ। সাবেক ব্যাংকার মাক্রোঁ ফরাসি রাজনীতির প্রজন্ম বদলের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়েছেন। যে রাজনীতিতে বছরের পর পর বছর ধরে কতগুলো পরিচিত মুখই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেছে।

বিশ্বের প্রতিক্রিয়া কি?

মাক্রোঁর জয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) চালকের আসনে যারা আছেন তারা। কারণ, মাক্রোঁর প্রতিপক্ষ লো পেন নির্বাচিত হলে ব্রেক্সিটের পর ইইউ নাজুক পরিস্থিতিতে নতুন করে তার কট্টর নীতির মুখে পড়ত।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান জ্য-ক্লদে জাঙ্কার এক টুইটে বলেছেন, ফ্রান্স ইউরোপের ভবিষ্যৎদ্রষ্টাকে বেছে নেওয়ায় তিনি খুশী।

ওদিকে, জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মের্কেল বলেছেন, “মাক্রোঁ লাখ লাখ ফরাসি জনগণ, জার্মানি এমনকি গোটা ইউরোপের মানুষের জন্য আশার সঞ্চার করেছেন।”

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে এক টুইটে লো পেনের প্রশংসা করলেও পরে মাক্রোঁর বিপুল জয়কে অভিনন্দন জানান এবং তার সঙ্গে কাজ করার অপেক্ষায় আছেন বলেও জানিয়েছেন।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, “সন্ত্রাস এবং সহিংস চরমপন্থার ক্রমবর্ধমান হুমকির মধ্যে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটা গুরুত্বপূর্ণ।”

মাক্রোঁর সামনে চ্যালেঞ্জগুলো কি?

তার প্রথম চ্যালেঞ্জই হবে ফ্রান্সে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। মাক্রোঁ একটি বিভক্ত জাতির দেশে জয় হাসিল করেছেন। যেখানে অর্ধেক ভোটারই কট্টরপন্থি প্রার্থীকে ভোট দিয়েছে।

মাক্রোঁ নিজেও জানেন যে, অনেক ভোটারই কেবল লো পেনের বিজয় ঠেকাতে তার পক্ষে ভোট দিয়েছে। ফলে সামনের দিনে পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোটারদের এ সমর্থন মাক্রোঁ নাও পেতে পারেন।

মাক্রোঁ আর লো পেনকে নিয়ে এই বিভক্তি কেবল ডান-বাম রাজনীতির বিভক্তি নয়, এটি জাতীয়তা এবং অস্তিত্বের পরিচয় নিয়ে বিভক্তি। পার্লামেন্ট নির্বাচনেও এ বিভক্তি রয়ে যাবে কিনা এ প্রশ্নে বিশ্লেষকরা বলছেন, এ বিভক্তি থাকবে বলেই মনে করছেন তারা।

ফলে এ বিভক্তি দূর করে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা মাক্রোঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এরপরই তার সামনে আরেকটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নিজের দলের জন্য পার্লামেন্টে যথেষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা।

১১ এবং ১৮ জুনে অনুষ্ঠিত হবে ফ্রান্সের পার্লামেন্ট নির্বাচন। মাক্রোঁকে এখন তার উত্থানকে পার্লামেন্টে তার দলের শক্তিশালী উপস্থিতির জন্য কাজে লাগানোর কাজ করতে হবে।

এজন্য দলের পক্ষ থেকে জোরেসোরে প্রচার চালাতে হবে তাকে। কারণ, খুব অল্পদিন হল গড়ে ওঠা মাক্রোঁর দলের এখনও পার্লামেন্টে উপস্থিতি নেই। দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে মাক্রোঁকে জোট গড়ার পথে যেতে হতে পারে।

এছাড়াও আছে মাক্রোঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের নানা চ্যালেঞ্জ। সরকারি ব্যয় কমানো, বেকারত্ব কমানো ছাড়াও শ্রম আইন শিথিল করা এবং স্বকর্মে নিয়োজতদেরকে নতুন করে সুরক্ষা দেওয়ার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করতে হবে তাকে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য