আজিজুল ইসলাম বারী,লালমনিরহাট থেকেঃ:”নেপলিয়ন বিশ্ববাসীর কাছে একটি স্মরণীয়-বরণীয় নাম।” তিনি আমাদের সকলের নিকট স্মরণীয়-বরণীয় এজন্য নয় যে,তিনি শুধু একজন দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সম্রাট ছিলেন। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সম্রাটগণের মধ্যে তিনি একজন এ কথা সত্য। আবার এও সত্য যে,আমরা তাঁকে বেশি স্মরণ করি তাঁর রেখে যাওয়া স্মরণীয় বাণী আর জীবনদর্শনের জন্য। আমাকে একটি ‘শিক্ষিত মা দাও আমি তোমাকে একটি শিক্ষিত জাতি দেব’-এ কথা কে না জানে? কী অমোঘবাণী! আমরা যদি একটা আদর্শ পরিবার গঠনের ক্ষেত্রে একজন মায়ের ভূমিকাকে দেখি, দেখব যে,একজন সচেতন শিক্ষিত মা কিভাবে তার শিশুকে লালন-পালন করে, কিভাবে পরিবারের সবার মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপন করা যায় তা দেখিয়ে দেয়।

আসলে একটি শিক্ষিত মাই পারেন একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দিতে। তিনিই পারেন জাতিকে সব ধরনের জরা-ব্যাধি থেকে মুক্তি দিতে। একটা পরিপুষ্ট জাতি উপহার দিতে। যদিওবা ‘শিক্ষার চাঁদ ফোঁটা’ নামক আমার একটি প্রবন্ধে আমি এ কথাটিকে একটু ভিন্নভাবে দেখার চেষ্টা করেছি। একজন শিক্ষিত মা থেকে একটা শিক্ষিত জাতি তৈরি করা যতটা কঠিন তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন বা প্রায় অসম্ভব কাজ হচ্ছে-একজন অশিক্ষিত মা থেকে একটা শিক্ষিত জাতি তৈরি। এই প্রায় অসম্ভব কাজটিই করেছেন লালমনিরহাটে কালীগঞ্জ উপজেলার জেলার প্রান কেন্দ্র কাকিনার নিভৃত পল্লীতে এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া কৃতী ব্যক্তিত্ব ড. মোজাম্মেল হক। দারিদ্রের কঠিন আঘাতে তিনি জর্জড়িত হয়েছিলেন। ঝরে যেতে যেতেও জীবন সংগ্রামে টিকে ছিলেন তাঁর অদম্য আত্মবিশ্বাস আর নিরলস পরিশ্রমের দ্বারা। জীবনের কঠোরতার কাছে তিনি পরাজিত হন নি। যারা দারিদ্র্যকে উন্নতির পথে প্রধান অন্তরায় হিসেবে মনে করেন তাঁদের কাছে তিনি হতে পারেন একটা জীবন্ত আদর্শ।

আজ কাকিনার মা-মাটির-মানুষের সঙ্গে যে দু’জন ব্যক্তির নাম সর্বাগ্রে চলে আসে তাঁর একজন বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের অন্যতম বিখ্যাত কবি শেখ ফজলল করিম। যিনি একজন মানবতার ও সুফীদর্শনৈর কবি বলে সমধিক পরিচিত। যিনি তাঁর অমর সৃষ্টির জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। প্রাত:স্মরণীয় তাঁর বাণী-কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর?মানুষেরি মাঝে স্বর্গ নরক, মানুষেতে সুরাসুর!আরেকজন একেবারে প্রচার বিমুখ পরার্থপর ব্যক্তিত্ব ড. মোজোম্মেল হক। যিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন মঙ্গাপীড়িত উত্তরাঞ্চলের মানুষ যেন তাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে পারেন। কেন না তিনি জানেন, একমাত্র শিক্ষাই পারে মানুষকে দারিদ্র্যের হাত থেকে মুক্ত করতে। এজন্য তিনি ১৯৯৪ সালে এলাকার আপামর জনগণকে সঙ্গে নিয়ে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের জেলার প্রান কেন্দ্র কাকিনায় প্রতিষ্ঠা করলেন উত্তর বাংলা কলেজটি। ২০০৮ সালে যেখানে তিনি ইংরেজি, অর্থনীতি, ব্যবস্থাপনা ও হিসাববিজ্ঞান এই চার বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু করলেন এর পরে বিবিএ (প্রফেশনাল),ফিন্যান্স,এন্ড ব্যাংকিং, পরিসংখ্যান,প্রাণিবিজ্ঞান উদ্ভিদবিজ্ঞান,সমাজবিজ্ঞান,রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস,ইসলামে ইতিহাস,মার্কেটিং, হিসাববিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা।

কলেজ সূত্রে জানাযায়, বছরের শুরুর দিকে মাস্টার্স কোর্স চালু করেছেন, অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা। প্রক্রিয়াধীন মাস্টার্স সমূহ: বাংলা,ইংরেজি, সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান,দর্শন ও মনোবিজ্ঞান। গ্রাম পর্যায়ে সম্মান শ্রেণিতে অধ্যয়ণের বিরল সুযোগ তৈরি করেছেন। গ্রামীণ নৈসর্গিক নিভৃত এলাকায় উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে যা কিনা একটি মাইলফলক হয়ে থাকল। তিনি একজন আত্মপ্রচারবিমুখ মানুষ। কলেজটির প্রতিষ্ঠালগ্নে তাঁর হিতাকাঙ্ক্ষীদের কেউ কেউ বললেন যে, তিনি যেন কলেজটি তাঁর নিজের নামে করেন। তারা পরামর্শ দিলেন,নিজের নামে জমি কিনে তারপর কলেজকে দান করতে। ড. মোজাম্মেল হক কারও কথা শুনলেন না। তিনি সরাসরি কলেজের নামেই জমি কিনলেন। কলেজের নাম দিলেন উত্তর বাংলা কলেজ। তাঁর দর্শন ছিল যে, এ কলেজ হবে সবার। সবার অংশগ্রহণ এবং সবার সহযোগিতায় কলেজটি এগিয়ে যাবে এটাই ছিল তাঁর সুপ্ত বাসনা। তাই তিনি দশজনের মধ্যে একাদশ হলেন না-হলেন দশজনের মধ্যে একজন । তিনি মনে করিয়ে দিলেন রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত চরণ-মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক/ আমি তোমাদের লোক। গ্লাসগোতে অবস্থিত স্ট্রাথক্লাইড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় ৪০ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞ প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. মোজাম্মেল হক রাজশাহী কলেজে কর্মরত অবস্থায় পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের জন্য স্কলারশিপ নিয়ে ১৯৭০ সালে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন। দূরপ্রবাসে গিয়েও তিনি দেশমাতৃকার কথা ভুলে যান নি।

মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে মত তৈরির জন্য সংগঠকের ভূমিকা পালন করতে গিয়ে তাঁকে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের দেয়া স্কলারশিপ হারাতে হয়েছিল। স্বদেশের প্রতি অকুণ্ঠ ভালবাসার জন্য তিনি বিদেশবিভূঁইয়ে একটি কঠিন ঝুঁকি নিয়েছিলেন। তিনি আমাদের নিকট জীবন্ত কিংবদন্তি। অর্থনীতির শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষকগণের জন্য তিনি রচনা করেছেন অসংখ্য বই। অতিথি অধ্যাপক হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান করেছেন। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করে নিজের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। এত বড় গুরুত্বপর্ণ পদে থেকেও ভুলে যান নি ড. মোজাম্মেল হক গরীব অসহায় গরীব মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য নিজের অর্থায়নে পড়া লেখার সুযোগ করে দিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের যাবতীয় সমস্যায় তিনি পাশে দাঁড়ান। তিনি শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন কর্মস্থান, হাতে কলমে শিক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। ড.মোজাম্মেল হক শিক্ষার্থীদের জন্য  কাকিনার প্রান কেন্দ্রে দর্শনীয় স্থাপন করেছেন।

কাকিনা জমিদার বাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়া হাওয়া-খানাটি সরক্ষরণে রেখেছেন। তিনি দক্ষ ম্যানেজিং কমিটি দ্বারা তার প্রতিষ্ঠানটি পরিচলনা করছেন। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় তিনি দারিদ্র পরিবারের মেধাবী শিক্ষক দের বিনা খরচে নিয়োগ প্রদান করেন। যা লক্ষ্য করা যায় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটি নিয়োগ নিয়ে একাধিক অভিযোগ পাওয়া যায়। শিক্ষকরা বলেন,জেলার মধ্য একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেটি উত্তরবাংলা কলেজ। ড.মোজাম্মেল হকের নিজ অর্থায়নে শিক্ষকদের পিএইচডি করারছেন। তিনি এলাকাবাসীর জন্য কাকিনায় বিনা চিকিৎসার ব্যবস্থা করছেন। যদিও তিনি কোন দূর দেশে থাকেন, তবুও তার জন্মস্থানের টান রয়ে যায়। দেশে ফিরে তার গ্রামের প্রতিটি মানুষের খোঁজ খবর নেন। গরীব অসহায় মানুষদের মূখে আহার তুলে দেন। তাদের জন্য শুধু খাবার নয়,পোশাক – পরিচ্ছেদের ব্যবস্থাও করেন। বাড়ি লোকজন ড. মোজাম্মেল হক সর্ম্পকে বলেন, ‘আসলে তিনি মানুষ নন, দেবতাতুল্য’,কখনো আমাদের মনে হয় না আমরা তার বাড়ির কাজের লোক। তিনিও কখনো আমাদের কে কাজের লোক মনে করেন না। তিনি মনে করেন আমার পরিবারের সদস্য তারা । ড.মোজাম্মেল হক কাকিনার মানুষের সেবার জন্য সোনালী ব্যাংক স্থাপনের ব্যবস্থা করেছেন।

তাঁর প্রতিবেশিদের তার উপরে বড় টান   কখন ড.মোজাম্মেল হক দেশে ফিরবেন। কখন আমাদের বাড়িতে পা দিবেন। তিনি অল্প সময় নিয়ে দেশে ফিরলেও সবার খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করেন। ৭৬ বছর বয়সে এসেও তিনি আমাদের নিকট দৃষ্টান্ত- একজন নিরলস কর্মী, স্বপ্নদ্রষ্টা, অনুপ্রেরণাদাতা,সাহিত্য-দর্শন-কর্মযজ্ঞের ক্লান্তিহীন পুরুষের। যিনি বলেন,ক্লান্তি আমার ক্ষমা কর প্রভু।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য