আজহারুল আজাদ জুয়েলঃ ‘সুধীর বাবুর দোকান’ এখন নেই! হারিয়ে গেছে ‘সুধীর বাবুর গলি!’ হারিয়ে গেছেন ‘সুধীরবাবু’ নিজেও! অথচ একদা তিনি দিনাজপুরের বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন। ছিলেন বড় ব্যবসায়ী। তাঁর ‘মাতৃভান্ডার’ নামের দোকানটি পরিচিতি পেয়েছিল সুধীর বাবুর দোকান নামে। দিনাজপুর জেলা শহরের চকবাজার মসলাপট্টির যে গলিতে ব্যবসা করতেন সেই গলি পরিচিতি পেয়েছিল ‘সুধীর বাবুর গলি’ নামে। তার নাম দিনাজপুর ছাড়িয়ে উত্তরবঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছিল।

সুধীর বাবুর পুরো নাম সুধীর চন্দ্র দে। ছোট বেলায় তাকে দেখেছি হালকা, পাতলা, সাধারণ মানুষ হিসেবে। আমার (লেখকের) বাবা  হোমিও চিকিৎসক আব্দুল আজিজ গডের আঁঠা কেনার জন্য প্রায়ই পাঠাতেন সুধীর বাউর দোকানে। খুব বেশি দূরে ছিল না এই দোকান। হেঁটেই যাতায়াত করা যেত। গনেশতলাস্থ আমাদের হোমিওপ্যাথিক দোকান হতে স্গংীত কলেজের (তখন এই কলেজ ছিলনা) গলি ধরে হেঁটে যেতাম ঐ দোকানে।

আমি অনেকদিন গিয়েছি। যতদিন গিয়েছি সুধীরবাবু দোকানে বসে থাকতে দেখেছি। তিনি গাহকদের তাকে যথেষ্ট সম্মান দেখাতেন। আমি যখন তার দোকানে যেতাম তখন স্কুল ছাত্র ছিলাম। কিন্তু তিনি আমাকেও গ্রাহক হিসেবে যথেষ্ট কদর করেছেন। অমায়িক আচরণ দেখিয়ে তুষ্ট করেছেন। এর কারণ গ্রাহকদেরকে তিনি লক্ষী মনে করতেন এবং একজন গ্রাহক যত অল্প পয়সার মালামাল নিক না কেন তিনি মনে করতেন এই গ্রাহকই তার আশির্বাদ।

সুধীর বাবুর দোকানে প্রচুর বেচা-কেনা হতো। সব সময় ভিড় লেগে থাকত। পাকিস্তান আমলে ঐ দোকানে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার বেচা-কেনা হতো। তখনকার প্রেক্ষাপটে এত বিপুল অর্থের বেচা-কেনার তথ্য আমার নিজের কাছেই অনেকটা অবিশ^াস্য বলে মনে হয়। কিন্তু কিছুদিন আগে এই তথ্য জেনেছি সুধীরবাবুরই এক পুত্রের কাছ থেকে। তার তৃতীয় পুত্র ভারত প্রবাসী অধীর কুমার দে এ বছরের মার্চ মাসে বাংলাদেশে এসেছিলেন। তখন তার সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল। তিনি তখন জানিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগের সময়গুলোতে তাদের দোকানে  প্রতিদিন ১০ হতে ১৫ হাজার টাকার বেচা-কেনা হতো।

দোকানে প্রায় দুই হাজার রকমের পণ্য বেচা-কেনার কাজ সামলানো হতো ১৫ জন কর্মচারীর সহযোগিতায়। কর্মচারীদের কয়েকজনের নাম পংকজ কুমার দাস, অনীল চন্দ্র ঘোষ, অভিভূষন কুন্ডু, বিশ^নাথ দাস, রাইমোহন গুহ, কান্ত প্রসাদ মন্ডল, পল্টু চন্দ্র দাস, মির্জা আবু তাহের, জয় গোপাল সাহা, নরেশ ঘোষ, কৃষ্ট সাহা, বলাই সাহা প্রমুখ। পংকজ কুমার দাস কাজ করেছেন সবচেয়ে বেশি, প্রায় ২৫ বছর। এছাড়া সুধীর বাবুর বড় ভাই কামাক্ষা চরন দে নিয়মিত কাজ করতেন ছোট ভাইয়ের দোকানে।

কি বিক্রি করতেন সুধীর বাবু? দোকানে যে ধরণের পণ্য বিক্রি করা হতো তাতে করে এটাকে একটি মুদিখানা হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। জিরা, ধুনিয়া, তেজপাতা, দাুরুচিনি, লং, ছোট এলাচ, বড় এলাচ, গুলমরিচসহ সব ধরণের মসলা, ঘি, ডালডা, লবন, চিনি, সেমাই, মসুর ডাল, খেসারি ডাল, বুট, বুটের ডালসহ নিত্যদিনের রান্নায় ব্যবহার্য সামগ্রী, রেজিয়া সোপের সাবানসহ বিভিন্ন ধরণের কাপড় কাঁচা সাবান, লাক্স, লাইফবয়, রেক্সোনাসহ নানা বর্ণের গোসল করা সাবান, আরো বিভিন্ন রকমের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য-সামগ্রী যা সাধারণভাবে অন্য সব দোকানেই পাওয়া যায়। তাহলে এই দোকানের এত নাম ডাক কেন ছিল? কেন মানুুষ সুধীর বাবুর দোকানে এসে ভিড় করতেন?

‘সুধীর বাবুর দোকানে পাওয়া যায় না এমন কিছু নাই’ আমার ছোট বেলায় এ রকম কথা প্রায়ই শুনতাম। একদিন সেটাই জানার চেষ্টা করলাম, কি পাওয়া যেত সেখানে। এই দোকানটি বিখ্যাত ছিল প্রধানত কবিরাজী ও হেকিমী ঔষধ তৈরীর উপকরণের জন্য। দিনাজপুর জেলায় যত কবিরাজ ও হেকিম ছিলেন তারা তাদের ঔষধ তৈরীর সমস্ত উপকরণ কিনতেন সুধীরবাবুর মাতৃভান্ডার হতে। এখানে চিরতা, বহেরা, আমলকি, হরতকি, সোনাপাতা, গোক্ষুরকাটা, বেলশুট, আদাশুট, অশোক ছাল, ঘৃতকুমারি, নিম, স্বর্ণ সিন্দুর, অশোক সিন্দুর, মকরধ্বজসহ বিভিন্ন গাছ-গাছড়ার ছাল, ডাল, শিকড়, তেল, পাতা ইত্যাদি কবিরাজি পণ্য পাওয়া যেত।

নিমের তেল, ড়েরির তেল, বাদাম তেল, জলপাই তেল, নারিকেল তেল, সরিষার তেলসহ নানান তেল পাওয়া যেত যা কবিরাজী ঔষধ, মালিশ তৈরীতে প্রয়োজন হতো। পুরাতন ঘি-এর দরকার হলে সুধীরবাবুর দোকনের বিকল্প ছিল না। কস্তুরি, জয়ফল,জাফরান, দয়িত্রি, মৃগনাভিসহ পোলাও-বিরানীর বিভন্ন উপকরণ, লাশ দাফনের জন্য গোলাপজল, কফুর,, ন্যাপথালিন, সনাতন ধর্মবলম্বীদের পুজার বিভিন্ন উপকরণ যেমন আলতা, সিঁদুর, কড়ি, পঞ্চসর্ষ, পঞ্চরতœ  (সেনা, রুপা, দস্তা, পিতল, কাঁসার উপকরণ), আসন অঙ্গরী, মধুপদের বাটি, গোগগুল ধুপ, চন্দন কাঠ, শাঁখা, পলা, হাতের খাডু, শিকই (কোমড়ে দেয়ার জন্য এক ধরণের সুতা, যা লাল ও কালো রং যুক্ত) ইত্যাদি পাবার একটাই দোকান, সুধীর বাবুর দোকান। এখানে বিয়ের রং পাওয়া যেত।

লাল, নীল, কালো যে কোন রং। কাঠের বার্নিশ রং, কাঠ রাঙ্গানোর স্প্রীট, সুগন্ধি ছড়ানো আতর যেমন জেসমিন, চন্দন, কস্তুরি, মুসকে আম্বর ইত্যাদি, চোখের সুরমা, কাপড় কাঁচা সোডা, পেট ঠান্ডা রাখার জন্য ইসবগুলের ভুষি, তকমা, তালমাখনা, তালমিছরি, কর্পুর, নেপথালিনসহ আরো হরেক পন্য।

সুধীর বাবুর দোকানে যত রকমের পন্য পাওয়া যেত, দিনাজপুরের আর কোথাও তা পাওয়া যেত না। এমন সব দূর্লভ পন্য যা উত্তরবঙ্গ জুড়েও পাওয়া না গেলেও দিনাজপুরের সুধীর বাবুর মাতৃভান্ডারে পাওয়া যেত। তার দোকানের বিভিন্ন পন্য কেনার জন্য রংপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নওগাঁ, জয়পুরহাট, গাইবান্ধা থেকে লোক আসতেন । বিশেষ করে ঔষধী পন্য, গাছের ছাল, ডাল, ফল, পাতা, শিকড় ইত্যাদি‘র জন্য ঐসব জেলার কবিরাজ, হেকিমরা আসতেন অথবা লোক পাঠিয়ে কিনে নিয়ে যেতেন।

বেশ কিছু অদ্ভুত রকমের পন্য পাওয়া যেত সুধীর বাবুর দোকানে যা শুনলে অবাক না হয়ে পারা যায়না। পুজার উপকরণ হিসেবে এখানে বিক্রি করা হতো কয়েক পদের মাটি ও লোম। মাটির মধ্যে থাকত শুকুরের প্রসাব করা মাটি, নদীর মাটি, বেশ্যাপড়ার মাটি, পঁচা পুকুরের মাটি ইত্যাদি। বাঘের লোম, শুকুরের লোম, বানরের লোম ইত্যাদি বিভিন্ন প্রাণীর লোম বিক্রি হতো এখানে। মানুষ এগুলো পুজা ও যাদুটোনা করার জন্য কিনতেন।

এইসব পণ্য সঠিকভাবেই দেয়া হতো, না কি প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে এক জায়গার মাটি আরেক জায়গার নামে, এক পশুর লোম আরেক পশুর নামে বিক্রি করা হতো। এমন প্রশ্ন ছিল সুধীর বাবুর দোকানে কাজ করেছিলেন এমন একজনের কাছে। নরেশ ঘোষ (৬৮) নামের ঐ কর্মচারীর বাড়ি সুধীর বাবুর দোকানের কাছে ছিল। তিনি বলেন, সুধীর বাবু প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে কখনো কোন পণ্য বিক্রি করতেন না। ব্যক্তিগতভাবে সৎ ও সাহসী মানুষ ছিলেন। ইন্ডিয়ান মাল রাখার কারণে তাকে তিনবার আটক করা হয়েছিল। কিন্তু তার সমস্ত মালামাল বৈধভাবে আনা ছিল বলে পুলিশ-বিডিআর শেষ পর্যন্ত তাকে ধরে রাখতে পারে নাই। তার স্মরণ শক্তি প্রখর ছিল। দোকানের কোন জায়গায় কি মাল আছে তা তার মুখস্ত ছিল। কর্মচারীরা কোন মাল খুঁজে না পেলে তিনি ২-৩ মিনিটেই তা খুঁজে বের করে আনতে পারতেন।

সুধীর কুমার দে তার দোকানের বেশিরভাগ পন্য ভারত থেকে আমদানী করতেন। জাফরানসহ বিভিন্ন পন্য আমদানী করতেন পাকিস্তান থেকে। তার তালমিছরি তৈরীর কারখানা ছিল। চিনি দিয়ে তৈরী তাল মিছরি বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলাসহ আসামে রপ্তানী করতেন। তার তালমিছরি অসম্ভব জনপ্রিয় ছিল বাংরাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বিভিন্ন জেলায়।
স্বাধীনতার আগে যে দোকানে প্রতিদিন ১০-১৫ হাজার টাকার ব্যবসা হয়েছে সেই দোকানের মালিকের আর্থিক অবস্থা কি পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিল তা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় কারো। ১৯৭৭ সালে ৮৫ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন সুধীর চন্দ্র দে ওরফে সুধীর বাবু। যতদিন বেঁচে ছিলেন, ততদিন রমরমা ব্যবসা করেছেন। প্রচুর অর্থ কামাই করেছেন। এর থেকে ধর্মীয় ও সামাজিক কাজে ব্যয় করেছেন। চকবাজার হরিসভা প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখেছেন।

বিপুল অর্থ কামাই করা সত্বেও সুধীর বাবু ব্যক্তি জীবনে অনাড়ম্বর জীবন যাপন করতেন। সমাজতন্ত্রে বিশ^স করতেন এবং কমিউনিস্ট পার্টিকে পছন্দ করতে। পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্ট নেতা জ্যোতিবসু এবং বাংলাদেশের তেভাগা আন্দোলনের নেতা গুরুদাস তালুকদার ও হাজী দানেশকে ¤্রদ্ধা করতেন। ফুটবলপ্রিয় ছিলেন, কিন্তু নিজে ফুটবল খেলেননি কখনো। তিনি দিনাজপুরের বড় মাঠে ফুটবল খেলা দেখতে যেতেন ছেলেদেরকে সঙ্গে নিয়ে।

সুধীর বেশি লেখা-পড়া করতে পারেননি। কোনরকমে স্বাক্ষর করতে পারতেন। তার প্রথম জীবন কেটেছে দারিদ্র্যের মধ্যে। পাকিস্তান সৃষ্টির সময় বাদাম, চানাচুর ফেরি করে বিক্রি করতেন বিভিন্ন স্থানে। কিছুটা আর্থিক সঙ্গতি হলে দিনাজপুর শহরের বালুবাড়িতে একটি ছোট দোকান দেন। অবস্থার যথেষ্ট উন্নতি হওয়ার পর ১৯৫৩ সালে দোকান সরিয়ে নিয়ে আসেন চকবাজার মসলাপট্টি এলাকায়। দোকানের নাম রাখেন মাতৃভান্ডার। কিন্তু দিনাজপুরের মানুষ এই নামের বদলে ‘সুধীর বাবুর দোকান’ নামের সাথে বেশি পরিচিত ছিলেন।

একজন সৎ মানুষ হিসেবে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে শ্রদ্ধেয় ছিলেন। তার দোকান তিনবার পুড়ে গিয়েছিল বলে জানা যায়। কিন্ত কোনবারেই দোকানে পণ্যের অভাব হয়নি। তার দোকানে পণ্য সরবরাহকারিরা যত টাকার পণ্য দরকার তা বাকিতে দিয়ে দিতেন। কারণ সবাই জানতেন যে, সুধীর বাবুর কাছে টাকা মার যাবে না।

সুধীরবাবু উত্তরবঙ্গজুড়ে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। সেই সাথে পরিচিতি পেয়েছিল তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তার মৃত্যুর পর ছেলেরা সঠিকভাবে দোকান চালাতে ব্যর্থ হয়। ক্রমাগত লোকসানের মুখে ব্যবসা নি¤œমুখী হতে হতে এমন এক অবস্থার মধ্যে পতিত হয় যে, ছেলেরা চরম অর্থ সংকটে পড়েন এবং দোকানটি বিক্রি করে দেন। দোকানটির জায়গায় এখন বাবা বস্ত্রালয় নামের একটি বড় কাপড়ের দোকান গড়ে উঠেছে যার মালিক অন্য কেউ। সুধীরবাবুর কেনা আরো অনেক জায়গা  বিক্রি করেছেন ছেলেরা।

সুধীর বাবুর ৫ ছেলে ২ মেয়ে। পর্যায়ক্রমে ছেলেদের নাম সুশিল চন্দ্র দে, প্রদীপ কুমার দে, অধীর কুমার দে ও রবীন্দ্রনাথ দে। একমাত্র মেয়ের নাম রত্না দে। সুশিল ১৯৫২ সালে এবং অধীর ১৯৭১ সালে ভারতে গিয়ে সেখানকার স্থায়ী নাগরিক হয়ে সরকারি চাকুরী নিয়ে এখন অবসরে আছেন। প্রদীপ মারা গেছেন, তবে তার ছেলে-মেয়েরা দিনাজপুরের চকবাজারে থাকেন। রবীন্দ্রনাথ দে চকবাজারে পৈতৃক বাড়ির ছোট্ট বারান্দায় একটি ছোট দোকান খুলেছেন। সেই দোকানে ‘সুধীর বাবুর দোকান’ লিখে একটি সাইনবোর্ড টানিয়ে বাবার স্মৃতি ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। আরেক ছেলে গোপাল নিখোঁজ রয়েছেন ৬-৭ বছর ধরে।

এখন সুধীরবাবু নেই, তার দোকান নেই, তার নামের গলি নেই। এখন তিনি অতীত, বিস্মৃত। তবে দিনাজপুরের হাজারো মানুষ এখনো তাকে স্মৃতিতে রেখেছেন। একজন বড়, সৎ, সাধারণ ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি এখনো শ্রদ্ধেয়।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য