কুড়িগ্রামে ধরলা নদীর ভাঙন প্রতিরোধে তিন গ্রামের ১৪ থেকে ১৫শ’ পরিবার একত্রিতভাবে শুরু করেছে স্বেচ্ছাশ্রমে পাইলিং। এজন্য আশপাশের প্রায় ২৫ গ্রাম থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে প্রায় ২ হাজার বাঁশ। প্রতিদিন অর্ধশতাধিক মানুষ পর্যায়ক্রমে পাইলিং-এর কাজে সহযোগিতা করছে। আর এজন্য বাড়ি বাড়ি চাল-ডাল সংগ্রহ করে কর্মক্লান্ত মানুষের মূখে খাবার তুলে দিচ্ছে গৃহিনীরা। সরকারি উদ্যোগ না থাকায় ভাঙন কবলিত কুড়িগ্রামের ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের নানকার এলাকায় চলছে এই পাইলিং-এর কাজ। ইতোমধ্যে ৩শ’ মিটার পাইলিং সম্পন্ন হয়েছে।

নানকার গ্রামের ভাঙন কবলিত কৃষক হবিবর রহমান জানান, গত ২/৩ বছরে আমার ৫০বিঘা ফসলি জমি, পাকা বাড়ি ধরলা নদীতে বিলিন হয়ে গেছে। আমার বাড়িতে ৪টা হাল ছিল। এখন আমি ফুফাতো ভাইয়ের হাত-পা ধরে তার জায়গায় ঠাঁই নিয়েছি। জমা-জমি, ঘরবাড়ি হারিয়ে নি:শ^ হবিবর রহমান দুচোখ মুছতে মুছতে বলেন, আমার বাড়িতে ৩জন কাজের লোক ছিল। এখন আমাকে পরের বাড়িতে কামলা দিতে হচ্ছে। কথাগুলো বলে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকলেন তিনি। তার স্ত্রী আঞ্জুমানআরা জানান, ‘নেকানেকি করি কি হইবে। হামার কপাল পুড়ি গেইচে, তাক কি ফেরৎ পামো!’

সরজমিন ঘুরে দেখা গেল, এই এলাকায় প্রায় ১২ কিলোমিটার জুড়ে চলছে ভাঙন। এখন ভাঙন না থাকলেও তার চিহ্ন বহন করছে গোটা তীরজুড়ে। শুধু নানকার নয়, এরসাথে সাতভিটা, কাইম বড়াইবাড়ী, নন্দদুলালের ভিটা, জগমোহনের চর, পাঙ্গারচর, সর্দারপাড়াসহ প্রায় ১০টি গ্রামজুড়ে ভাঙনে বিলিন হয়ে গেছে ঘরবাড়ী, আবাদিজমি ও বৃক্ষরাজি।

নানকার ও নন্দদুলালের ভিটা এলাকার ছানছার আলী (৭০), ফিচারী (৭২), লোকমান (৫৬), আব্দুল হাকিম (৫২), মেহেরভান (৩৮) ও ছকিনা (৪৫) জানান, গত ২/৩ বছরে এই এলাকায় প্রায় দেড় শতাধিক বাড়ি নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। ভেঙে গেছে একরের পর একর ফসলী জমিন। হুমকীর মূখে রয়েছে নন্দদুলারের ভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। মাত্র ২০ফিট দূরেই প্রবাহিত হচ্ছে ধরলা নদী। তারা অভিযোগ করেন, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে রিলিফ আর বাড়ি ভাঙার তালিকা নিয়ে লোকজন চলে যায়, কিন্তু ভাঙন প্রতিরোধে কোন ব্যবস্থা নেয় না। এলাকার মানুষ রিলিফ চান না। তারা ভাঙন প্রতিরোধে সরকারের সহযোগিতা চান।

নন্দদুলারের ভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক আব্দুল মালেক জানান, আড়াই শ’ শিক্ষার্থী নিয়ে এই দ্বিতল বিশিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি আগামী বছর টিকবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। অনেক দেনদরবার করেও সরকারিভাবে কোন প্রটেকশনের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে আমরা হতাশ।

পাইলিং কাজের উদ্যোক্তা মজিবর রহমান (৪৬) জানান, প্রতিবছর ভাঙনের সময় আমরা চেয়ারম্যানসহ সরকারি দলের নেতাকর্মীদের জানাই। কিন্তু তারা কোন উদ্যোগ নেয় না। তারা চাল দেয়, টাকা দেয় কিন্তু ভাঙন ঠেকানোর জন্য আশ^াস দিলেও কাজ করে না। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বলেও কোন সহযোগিতা না পাওয়ায় আশপাশের লোকজনকে ডেকে পাইলিং-এর কাজের কথা বলি। এতে সাতভিটা, নানকার ও কাইম বড়াইবাড়ি গ্রামের ১৪/১৫শ’ পরিবার এই কাজের জন্য আগ্রহ দেখায়। তাদেরকে নিয়েই আমরা কাজটা শুরু করেছি।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম জানান, কুড়িগ্রামে ধরলা নদীর বাম ও ডানতীরে ভাঙন কবলিত এলাকার জন্য প্রকল্প তৈরীর কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। ভোগডাঙ্গায় যারা ভাঙন প্রতিরোধে অস্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহন করছে, তাদেরকে কারিগরি সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে। বরাদ্দ পেলে কাজ শুরু করা হবে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য