06 দৃষ্টি প্রতিবন্ধী কবি আফছার পেটের দায়ে ভিক্ষে করে গান গজল আর স্ব-রচিত কবিগান গেয়ে যে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী এক সময় লোকজনকে আনন্দ দিত, মাতিয়ে রাখতো আসর, রুঢ় বাস্তবতায় আজ সে জীবিকার তাগিদে ভিক্ষে করে সংসার চালায়। রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার মিঠিপুর ইউনিয়নের নন্দরাম ফতেহপুর কুটিপড়া গ্রামের মৃত আসগর আলীর পুত্র আফছার আলী(৬৫)। কিশোর বয়স থেকেই গান বাজনার প্রতি ঝুকে পড়ে আফছার আলী। ঢোলক বাজিয়ে গান গজল আর কবি গান পরিবেশন করে এক সময় নিজেই কবি গান রচনা করতে শুরু করে।

স্থানীয় মুখরোচক কাহিনীকে অবলম্বন করে তার রচিত কবি গান গুলো সেই সময় এই এলাকায় বেশ জনপ্রীয় হয় ওঠে। বিশেষ করে স্বাধীনতা যুদ্ধের উপর তার রচিত কবি গান, পাক সেনাদের ভয়ে বাড়ি ঘর ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া,রাজাকারদের ভুমিকা আর হটকারিতা গুলো সে গানের মধ্যে দিয়ে স্থানীয় ভাষায় যে ভাবে বর্ণনার মাধ্যমে চিত্রায়িত করেছে, তা বাস্তব ঘটনাকেও হার মানিয়েছে।

এক সময় বিভিন্ন হাট বাজারে এগুলো পরিবেশন করে আসর জমিয়ে তুলতো আফছার আলী। পীরগঞ্জ উপজেলার হাট বাজার গুলো ছাড়াও রোজ আশপাশের উপজেলার বড় বড় হাট বাজার গুলোতেও আসর জমাতো সে। আসর শেষ হলেই উপস্থিত লোকজন আগ্রহ ভরে ২/১ টাকা করে তার হাতে গুঁজে দিত। এতে প্রায় প্রতিদিন এক থেকে দেড়’শো টাকা রোজগার হতো।

যা দিয়ে অনায়াসে তার সংসারের যাবতীয় প্রয়োজন মিটতো। বিশ বছর বয়সে বিয়ে করলেও আফছার আলীর সংসারে কোন ছেলে পুলে নেই। ছোট ভাইয়ের এক মেয়ে কে দত্তক নিয়ে লালন পালনের পর উপযুক্ত বয়সে বিয়েও দিয়েছে। বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়ায় আজ তার হাতে ঢোলক এর পরিবর্তে ঠাঁই পেয়েছে হাটাচলার অবলস্বন হিসেবে একটি লাটি আর অপর হাতে ভিক্ষের ঝুলি। হাতের লাঠিকে অবলম্বন করে রোজ ১৫/২০ কি:পথ মাড়িয়ে রোজগার হয় মাত্র ৪০/৫০ টাকা।

যা দিয়ে তার সংসারের চাকা ঘোরাতে গিয়ে হিমসিম খেতে হচ্ছে। যে কারনে অনাহার আর অর্ধাহার এখন তার নিত্য সঙ্গি। এক সময় যার গান শুনে শতশত লোকজন জড়ো হতো, সেই লোকজনের কেউই আর এখন তার দিকে ফিরেও তাকায় না। জীবন যেন আর চলে না। তাছাড়া চলাফেরাতেও সীমাবদ্ধতা এসেছে। আগের মতো আর চলতেও পারছে না সে।

জীবন সায়াহ্নে এসে জীবন যুদ্ধে আফছার আজ পরাজিত সৈনিক। তার দু চোখে এখন শুধুই অন্ধকার ! সমাজে অনেক বড় বড় বিত্তবান ব্যক্তি রয়েছেন। যারা শত শত আফছারের ভরন পোষনের দায়িত্ব নিতে পারেন। জগৎ সংসারটা বুঝি এ রকমই। পাশ কেটে পথ মাড়িয়ে চললেও কেউ আফছারের  পানে ফিরেও তাকায় না !

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য