কুড়িগ্রামে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের দাফন সম্পন্নজন্মভুমির টানেই কুড়িগ্রামে ফিরে এলেন কবি সৈয়দ শামসুল হক। তিনি সায়িত হলেন তার প্রিয় জন্মভুমির কোলে। তার প্রিয় জলেশ্বরীর বুকে। যেন শান্তির ঘুম। ঘুমাও কবি ঘুমাও। শান্তিতে ঘুমাও। না ফেরার দেশের এ চিরনিদ্রা দেখতে হাজার-লাখো মানুষের ভির। জীবিত কবির চেয়ে আজ মৃত কবি যেন অনেক শক্তিশালী। অনেক জনপ্রিয়। সবার প্রাণের মানুষ। বুধবার শেষ বিকেলে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ মাঠ কানায় কানায় ভরা লাখো মানুষে। যেমনটি ভরা ছিল গত বছর ১৫ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভা এই মাঠে, সেদিন এ কবি ছিলেন তার সফর সঙ্গি।

বিকাল সাড়ে ৪টায় মরহুমের নামাজের জানাজা শেষে কলেজ মাঠের শেষ প্রান্তে ৫টার দিকে সব্যসাচি লেখক সৈয়দ শামসুল হককে সমাহিত করা হয়। এর আগে বিকাল ৪টায় সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নুর, সাবেকমন্ত্রী নানক, কবিপত্নী আনোয়ারা সৈয়দ হক, একমাত্র পুত্র তুর্জোসহ নিকট আতিœয়রা হেলিকপ্টারে করে লাশ নিয়ে কলেজ মাঠে অবতরণ করেন। লাশ রাখা হয় একটি মঞ্চে। সবার আগে মহামান্য রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী’র পক্ষ থেকে পুস্পমাল্য অপর্ণ করা হয়। এরপর জেলা পরিষদ প্রশাসক, জেলা প্রশাসক, পুলশ সুপার, জেলা জাজশীপ ও চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রট আদালত, মুক্তিযোদ্ধা সংসদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, স্কুল, কলেজ, সাংস্কৃতিক সংগঠণ, পেশাজীবী সংগঠণ, রাজনৈতিক দল ও তার সহযোগী সংগঠণ গুলো একে একে পুস্পমাল্য অর্পণ করে। কবির কফিন ফুলে ফুলে ভেসে যায়। ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে আসে রংপুর, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, ঠাকুরগাও, পঞ্চগড়, দিনাজপুর, নীলফামারী জেলার শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী ও সাহিত্যিমনা মানুষ। এ যেন ছিল এক মিলন মেলা। কবির জন্ম কুড়িগ্রাম শহরের থানাপাড়ায়। তিনি অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত রিভারভিউ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করার পড় ৯ম শ্রেণীতে ওঠার পর ঢাকায় চলে যান। যিনি তার জীবনের অধিকাংশ লেখায় কুড়িগ্রামকে তুলে এনেছেন। কুড়িগ্রামকে দেশবাসীর কাছে তুলে ধরেছেন। তার শেষ ইচ্ছা বাস্তবায়নে কুড়িগ্রামে সমাহিত করা হয়।

যে সজনে গাছে লাল রঙের পাখি দেখে কবি এগার বছরেই কবিতা লিখেছিলেন। সেই কবিতা লাল পাখির মতো ডানা মেলে তাকে নিয়ে গেছে সাহিত্যের সব ক্ষেত্রেই। তিনি বিচরণ করেছেন সংস্কৃতির প্রতিটি পরতে পরতে। তার পায়ের আওয়াজে মুগ্ধ হয়ে গেছেন সাহিত্য প্রেমিরা। ব্রিটিশ বিরোধী নুরলদীনকে তিনি চিনিয়েছেন কাছ থেকে। তার জলেশ্বরী কুড়িগ্রামকে স্থান করে দিয়েছে সাহিত্যাঙ্গনে। এই সব্যসাচী লেখক সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেলেও তার অমর গাঁথা তাকে বেঁচে রাখবে চিরদিন। বুধবার তার মরদেহ কুড়িগ্রামে আসবে শুনে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন ছুটে এসেছেন তাকে এক নজর দেখার জন্য। রাত থেকেই কর্মযজ্ঞ চলছিল। চারদিকে ঘিরে কৌতুহলী মানুষ তার সম্পর্কে জানতে চাইছিল অনেক কিছুই। শহর জুড়ে চলছিল মাইকিং। সাধারণ মানুষ কবিকে ঘিরে করছেন নানান প্রশ্ন। কৈশরে কুড়িগ্রামের ধরলা নদীর অববাহিকায় বেড়ে ওঠা এই মানুষটি তার স্বপ্নের জলেশ্বরী নদীর মাধ্যমে ভীষণভাবে খুঁজে পায় উত্তরের রংপুর, গাইবান্ধা, নীলফামারী, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁ, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার বিভিন্ন পটভুমিকে। ইতিহাস ও সংস্কৃতির ইতিবৃত্ত।

কবির শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণে বিকেলে দাফন করা হয়। তার ইচ্ছার মর্যাদা দেওয়ায় কবি ১১ মার্চ ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে লিখে গেছেন, ‘আমার ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে আপনারা যে সিদ্ধান্ত গ্রহন করেছেন, এতে আমি আনন্দিত এবং আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমার জন্মস্থান আমার শেষ ঘর হবে। এটাযে আমার বহু দিনের ইচ্ছা এবং আমার পরিবার পরিজন সে ভাবে প্রস্তুত। তারাও আপনাদের সিদ্ধান্তে আনন্দিত ও কৃতজ্ঞ। আমার স্বশ্রদ্ধ সালাম রইল।’

কবি পুত্র তুর্জো মরহুমের নামাজে জানাজার আগে বলেন, জলেশ্বরী আজ তোমার ছেলে তোমাকে ফিলে এনেছে তোমার কাছে। হৃদয়ের কাছে। ভালবাসার কাছে। প্রিয় জন্মভুমির কাছে। আমি গর্বিত। একসাথে গর্বে বুকফেটে যায় এত মানুষের ভালবাসা দেখে। প্রধানমন্ত্রী ও সংস্কৃতি মন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান তার বাবার শেষ ইচ্ছা পুরনে সহায়তা করবার জন্য। সেই সাথে কুড়িগ্রামবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা। আমার বাবা খুব খুশি হয়েছে এ মাটিতে সায়িত হতে পেরে।

কুড়িগ্রাম সবুজ পাড়ায় অবস্থিত সৈয়দ হকের ছোট ভাইয়ের সহপাঠি গৃহসংস্থান অধিদপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত এস্টিমেটর আবুল ফজল মন্ডল জানান, সৈয়দ শামসুল হক যখন কুড়িগ্রামে পড়তেন, তখন রিভারভিউ স্কুল নাম ছিল না। বর্তমানে প্রগতি সংসদ সংলগ্ন জেলা শিল্পকলা একাডেমির ভবনের জন্য নির্ধাতির স্থানের পাশেই ছিল এম, ই স্কুল (মিডিল ইংলিশ স্কুল) যা ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত ছিল। পাশেই ছিল এইচ,ই স্কুল (হাই ইংলিশ স্কুল)। যা ৭ম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ছিল। সৈয়দ হক তখন আমাদের সাথে এই দুটি স্কুলে পড়তেন। পরে সরকার হাই ইংলিশ স্কুলটি সরকারিকরণ করে। নদীভাঙনের সম্ভাবনা থাকায় সেটি বর্তমান রিভারভিউ স্কুলে স্থানান্তরিত করে নামকরণ পাল্টে ফেলা হয়। সৈয়দ হকের বাড়িতে আমি প্রায়ই যেতাম। তাদের বসতবাড়িতে ছিল হোমিও প্যাথিক রিসার্চ সেন্টার। তিনি চুপচাপ থাকতে পছন্দ করলেও, দুরন্তপনাও করতেন। আমরা যখন ১৯৫৪ সালে এইচ,ই স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন পাশ করি, তখন তিনি ঢাকার বাসা লক্ষিপুরে চলে যান।

‘কুড়িগ্রামের প্রবীণ সাংবাদিক ও জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি একেএম সামিউল হক নান্টু জানান, সৈয়দ হক আর আমি কুড়িগ্রাম রিভারভিউ স্কুলের শিক্ষার্থী ছিলাম। আমি ছিলাম ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে  আর উনি ছিলেন ৯ম শ্রেণিতে। ভীষণ দুরন্ত ছিলেন সৈয়দ হক। তার বাবার ছিল হোমিওপ্যাথিক দোকানের ব্যবসা। শহরের ঐতিহ্যবাহি জাহাজমোড়ে তার মায়ের নামে ছিল নুরজাহান মেডিকেল হল। সৈয়দ হক মেট্রিক পাশ করে বাড়ি থেকে পালিয়ে মোম্বাই যান সিনেমা জগতে কাজ করতে। তার বাবার ইচ্ছে ছিল, ছেলেকে ডাক্তার বানানোর। পরে তিনি আবার কুড়িগ্রামে ফিরে আসেন। কিন্তু বাবার ইচ্ছা পুরনে ডাক্তার না হলেও তাঁর কবির খ্যাতি বিশ্বময়।’

জেলা প্রশাসক খান মোঃ নুরুল আমিন জানান, সন্ধ্যার পর পৌর মেয়র আব্দুল জলিলকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে মাটি দিয়ে ৩শতক পরিমান ধান ক্ষেত ভরাট করবার জন্য। এরপর সেখানে কবর খুরে প্রস্তুত রাখা হয়। এছাড়া অন্যান্য প্রস্তুতি নেয়া হয়। এব্যাপারে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ৭টায় কালেক্টরেট সম্মেলন কক্ষে কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর সাবিহা খাতুনসহ অন্যান্যদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করা হয়েছে। সেই সাথে ঠিক করা হয়েছে বরেণ্য এই লেখকের শেষ বিদায়ের কর্মপরিকল্পনা। যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের লেখকের শেষ ইচ্ছা পুরণে যেন কোন ঘার্তি না হয় সে ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন। কারণ গত ৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী কুড়িগ্রাম সফরে এসে এ ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েগেছেন। সে মোতাবেক বুধবার যথাযোগ্য মর্যাদায় কবিকে সমাহিত করা সমাহিত করা হয়েছে। মঙ্গলবার থেকে কবর স্থানে পুলিশ পাহাড়া রাখা হয়েছে।

কুড়িগ্রামে তার ছোট ভাই এ্যাডভোকেট আজিজুল হক পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। এ বাড়িতে দুদিন থেকে মানুষের ঢল। সবাই খোঁজ খবর নিচ্ছেন। এ্যাডভোকেট আজিজুল হক সবার কাছে দোয়া ও মঙ্গল কামনা করেছেন তার প্রিয় বড় ভাইয়ের জন্য। ধন্যবাদ জানান, কুড়িগ্রামের প্রশাসন ও কুড়িগ্রামবাসীকে তাঁর ভাইয়ের শেষ ইচ্ছা পুরনে সহায়তা করবার জন্য।

কুড়িগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক মোঃ জাফর আলী জানান, সৈয়দ হক গত বছর ১৫ অক্টোবর কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ মাঠে এক বিশাল জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গি হিসাবে বক্তব্য রাখেন। কুড়িগ্রামের মানুষের জন্য কাজ করতে প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন। তিনি ঐ জনসভায় বলেন-‘কুড়িগ্রামে এখন মঙ্গা নেই। কুড়িগ্রাম এখন চাঙ্গা’।

পরে চলতি বছর কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে যোগ দিয়ে কুড়িগ্রামের মাটিতে শায়িত হবার দ্বিয়ীয়বারের মতো ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এইদিন তিনি কলেজের মাঠ সংলগ্ন ধান ক্ষেত দেখে তার পছন্দের কথা জানান। এর পর কলেজ কর্তৃপক্ষ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুমতি চেয়ে পত্র পাঠায়। সর্বশেষ গত ৭সেপ্টেম্বর আবারো প্রধানমন্ত্রী কুড়িগ্রাম সফরে এসে এ খবর জানতে পেরে-‘তার শেষ ইচ্ছা পুরনে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শিক্ষা মন্ত্রালয়কে নির্দেশ দেন। এরপর দ্রুত সব নড়াচড়া শুরু করে। এরপরই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ আসে।

কুড়িগ্রাম আইজীবী সমিতির সভাপতি ও পাবলিক প্রসিকিউটর এ্যাডভোকেট আব্রাহাম লিংকন বলেন, মুলত কুড়িগ্রাম প্রেস ক্লাবের উদ্যোগে ২০১২ সালে সৈয়দ হককে কুড়িগ্রামে নাগরিক সংবর্ধনা দেয়া হয়। সেই সময় তিনি তার বক্তব্যে প্রথম জানান, মৃত্যুর পর তিনি কুড়িগ্রামের মাটিতে শায়িত হতে চান। এ ব্যাপারে তার স্ত্রী ও সন্তানের কোন আপত্তি নেই। কিছু জটিলতা ছিল তা প্রধানমন্ত্রীর হস্থক্ষেপে নিরসন হয়। সৈয়দ হক সব সময় বলতেন-‘আমার হৃদয়ের সাথে কুড়িগ্রামের মাটির সম্পর্ক। এটান উপেক্ষা করতে পারি না। তাই কুড়িগ্রামের মাটি হোক আমার শেষ ঠিকানা।’

জেলা মহিলা পরিষদের সম্পাদক প্রতিমা চেšধুরী জানান সব্যসাচী কবি সৈয়দ শামসুল হক আমাদের কুড়িগ্রামের সন্তান। তিনি তার লেখনীতে নারী জাগরণের এ অসাম্প্রদায়িকতার কথা বার বার উঠে এসেছে। তিনি আরও বলেন সাহিত্যে কবিতায় আর গানে কুড়িগ্রামের নারীদেও বিভিন্ন ভাবে তুলে নিয়ে এসছেন তিনি। তার মৃত্যুতে  আমরা এক স্বজন হারালাম। এই ক্ষতি পুরন হবার নয়।

কুড়িগ্রাম সরকারী কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর সাবিহা খাতুন জানান সব্যসাচী এই লেখক  এর মৃত্যুতে সবার মত আমরাও শোকাহত। আমরা গর্বিত এমন একজন মহান ব্যক্তিত্বকে তার অন্তিম ইচ্ছে অনুযায়ী আমাদের কলেজের মাঠ সংলগ্ন ধান ক্ষেতে তাকে শায়িত করতে পেরেছি।

যারা শ্রদ্ধা জানায়
তার কফিনে ঢল নামে সাধারণ মানুষের। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক শিক্ষার্থীসহ গণমাধ্যম কর্মী, জেলা প্রশাসনের লোকজন, রাজনীতিবিদ, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও পেশাজীবী লোকজন। সবার আগে মহামান্য রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী’র পক্ষ থেকে পুস্পমাল্য অপর্ণ করা হয়। এরপর জেলা পরিষদ প্রশাসক, জেলা প্রশাসক, পুলশ সুপার, জেলা জাজশীপ ও চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রট আদালত, মুক্তিযোদ্ধা সংসদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, স্কুল, কলেজ, সাংস্কৃতিক সংগঠণ, পেশাজীবী সংগঠণ, কুড়িগ্রাম প্রেস ক্লাব, তরুণ লেখক ফোরাম, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও তার সহযোগী সংগঠণ গুলো একে একে পুস্পমাল্য অর্পণ করে। কবির কফিন ফুলে ফুলে ভেসে যায়। ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে আসে রংপুর, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, ঠাকুরগাও, পঞ্চগড়, দিনাজপুর, নীলফামারী জেলার শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী ও সাহিত্যিমনা মানুষ। রংপুর বিভাগীয়  সাহিত্য পরিষদ, রংপুর রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, রংপুর শিক্ষক পরিষদ প্রমুখ।

কুড়িগ্রামের কবি তুমি ,সারা বিশ্ব জানে তোমার নাম/সাহিত্য সাধনা দ্বারা এনেছ সুনাম/তোমার লেখায় ফুটে  উঠেছে বাঙ্গালীর কষ্টকর জীবনধারা/তোমার লেখাই বিশ্ববাসীকে করেছে আত্মহারা/ সাহিত্য -সংগ্রাম করেছো আজীবন/ বিশে^ও মানুষকে করেছো আপন। সব্যসাচী কবি সৈয়দ শামসুল হককে উদ্দেশ্য করে একটি কবিতা লিখে কুড়িগ্রাম কলেজ মাঠে নিয়ে এসেছে কুড়িগ্রাম সরকারী বালক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেনীর ছাত্র সুরঞ্জন মজুমদার।

কলেজ মাঠে এসে নীরব দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। নীরবে চোখের জল মুছছে। সুরঞ্জন জানায় তিনি আমার প্রিয় কবি ছিলেন। আমি ছোট বেলা থেকে আমাদের ক্লাসের বই এ তার কবিতা এবং গল্প পড়েছি। তার লেখায় অনুপ্রাণিত হয়ে এ পর্যন্ত ৩৫টি কবিতা লিখেছি। শুধু সে একা নয় ভোর থেকে হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছে কুড়িগ্রাম সরকারী কলেজ মাঠে। জেলার ৯টি উপজেলা এবং আশে পাশের লালমনিরহাট, রংপুর,গাইবান্ধা, থেকেও মানুষ এসেছেন বাংলা সাহিত্যের ক্ষনজন্মা পুরুষ অগ্রগণ্য কবি সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হককে এক নজর দেখতে। তিনি কালজয়ী সৃষ্টির মাঝে নিলেন শেষ আশ্রয়।

সাংস্কৃতিক অঙ্গণে শোকের ছায়া
খ্যাতিমান লেখক সৈয়দ শামসুল হকের মুত্যুতে কুড়িগ্রামের সাহিত্য সাংস্কৃতিক অঙ্গণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কুড়িগ্রামকে গৌরবাম্বিত করা এই মহাল ব্যক্তিত্বকে হারানোয় শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন সাংস্কৃতিক অঙ্গণের ব্যক্তিত্বরা।

কুড়িগ্রামে জেলা শিল্পকলা একাডেমীর সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ রাশেদুজ্জামান বাবু বলেন, বাংলাদেশকে পুরো বিশে^র দরবারে তুলে ধরেছেন যিনি, তিনি আমাদের কুড়িগ্রামের সন্তান। তার মৃত্যুতে আমাদের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গণের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে।

কুড়িগ্রাম তরুণ লেখক ফোরামের সাধারণ সভাপতি আব্দুল খালেক ফারুক বলেন, ‘তার দীর্ঘ লেখক জীবনে তিনি নানাভাবে মাতৃভূমির ভাষা, কৃষ্টি ও মানুষের কথা তুলে ধরেছেন। তার শেষ বিদায়ের বেলাতেও তিনি জন্মস্থানের কথা ভুলে যাননি’।

কুড়িগ্রাম সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আহবায়ক শ্যামল ভৌমিক সব্যসাচী এই লেখকের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘তিনি ছিলেন মৌলবাদের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠস্বর। তার লেখনীতে দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের কথা বিষেশভাবে উল্লেখ করা হয়েছে’।

তার প্রিয় স্কুলে শোকসভা
সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যুতে তার প্রিয় রিভার ভিউ স্কুলে শোক সভা অনুষ্টিত হয়। সেই সাথে স্কুলে ছুটি ঘোষনা। নিরবতা পালন, দোয়া মোনাজাত করা হয়। আজ বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় বিদ্যালয় ভবনের সামনে অনুষ্টিত হয়। বক্তব্য রাখেন প্রধান শিক্ষক মহিউদ্দিন আহাম্মেদ, শিক্ষক মো. ফয়েজ উদ্দিন, মো. সাহাদৎ হোসেন এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও শতবষ উদযাপন পরিষদের সাধারন সম্পাদক সফি খান। এসময় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা কান্নায় ভেঙ্গে পরে। বিকেলে কলেজ মাঠে কবিকে স্কুলের পক্ষ থেকে শেষ ¯্রােদ্ধা জানান হবে।

প্রধান শিক্ষক মহিউদ্দিন আহাম্মেদ বলেন সৈয়দ শামসুল হক এ বিদ্যালয়ের ছাত্র হওযায় আমরা সবাই গৌরবান্নিত। তার পরিবারের প্রতি শ্রোদ্ধা জানাই। তিনি গত বছর এ বিদ্যালয়ের শতবাষির্কী অনুষ্টানের উদ্বোধন করে। বিদ্যালয়ের মাটি নিয়ে কপালে ছোয়ান। এতেই বোঝা গেছে কুড়িগ্রামে প্রতি ও স্কুলের প্রতি তার ভালবাসা। তিনি প্রথম শ্রেনী থেকে ৬ষ্ট শ্রেনী পর্যন্ত এানে পড়াশুনা করেন।

সফি খান বলেন তিন কুড়িগ্রামের মাটিতে জন্ম নিলেও নাগরিক সন্মর্ধনা পায়নি। এই তাগিত ও দু.খ বোধ থেকে ২০১১ সালের ১মার্চ তাকে কুড়িগ্রাম পৌরসভা মাঠে সম্বধনা দেই। সেই সময় তিনি ঘোষনা করেন আমার মৃত্যুর পর কুড়িগ্রামের মাটিতে শায়িত হতে চাই। পরবর্ত্তিতে গত বছর জন্মশত বাষিকী অনুষ্টানে একেই কথা বলেন। গত আক্টোবর মাসে প্রধানমন্ত্রীর সাথে কলেজ মাঠে জনসভায় এসে তিনি এই ঘোষনা। সেই প্রেক্ষিতে তাকে কুড়িগ্রাম সরকারী কলেজ মাঠের প্রবেশ দ্বারের দক্ষিন দিকে শায়িত করা হবে।

হেলিকপ্টার অবতরণ
বুধবার বিকাল ৪টায় কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ মাঠে হেলিকপ্টার নামে কবির মরদেহ নিয়ে। সঙ্গে ছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রী, তাঁর স্ত্রী, পুত্রসহ নিকট আতিœয়। এরপর কলেজ মাঠের পশ্চিম দিকে নির্মিত স্টেজে রাখা হয় কফিন। সেখানে এক একে শ্রদ্ধা জানায় সবাই। ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় কফিন। বিকাল ৪টা ৪০ মিনিটে জানাজা শুরু হয়। জানাজা পড়ান কুড়িগ্রাম আলীয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা নুর বখত। এর পর ৫টায় কলেজ মাঠের পশ্চিম দিকের শেষ প্রান্তের ধান ক্ষেতে বালুদিয়ে ভরাট করা স্থানে সায়িত করা হয় তাঁকে। এর পর সোয়া ৫টায় কবির আতœার শান্তি কামনা করে দোয়া করা হয়।

মৃত: সৈয়দ হক শক্তিশালী
জীবিত সৈয়দ হকের চেয়ে মৃত সৈয়দ হক অনেক বেশী শক্তিশালী ও জনপ্রিয়। তার প্রাণ মিলেছে তাঁর জানাজায়। লালো মানুষের সমাগম। বৃদ্ধ, শিশু, নারী, শিক্ষার্থী কেউ বাদ যায়নি। সব বয়সী মানুষের ছিল ঢল। যেন মানুষের মিলন মেলা। অথচ এই সৈয়দ হক যখন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কুড়িগ্রা আসেন, তখন কিন্তু এত মানুষের ঢল কিংবা আগ্রহ ছিল না। তাই জেলা সিপিবি নেতা আক্তারুল ইসলাম রাজু বলেন, মৃত্যুর পর সৈয়দ হক অনেক বেশী শক্তিশালী ও জনপ্রিয় তা আর একবার প্রাণ করল।

প্রশাসনের নির্ঘম রাত
আকস্মিক মৃত্যুর খবর জানার পর কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন ব্যস্ত হয়ে পড়ে। জেলা প্রশাসক খান মোঃ নুরুল আমিন, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তবারক উল্লাহ, জেলা পরিষদের প্রশাসক মোঃ জাফর আলী, কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর সাবিহা খাতুন, পৌর মেয়র আব্দুল জলিল, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আব্রাহাম লিংকন সমন্বয় করে মঙ্গলবার বার সন্ধ্যা থেকে বুধবার বিকালে কবরস্থের পূর্ব পর্যন্ত ছিলেন তৎপর। এক প্রকার নির্ঘুম রাত কাটাতে হয় তাদের। তিন শতক পরিমান নীচু ধান ক্ষেতে মাটি কেটে উচু করে এ কবরের ব্যবস্থা করতে হয় তাদের। নেয়া হয় লার্টিসহ নিরাপত্তার বিশেষ ব্যবস্থা। ২৪ঘন্টা পাহাড়ায় রাখা হয় পুলিশ। ধান ক্ষেতের পানি নিস্কাশন করে ফায়ার সার্ভিস।

কবির গ্রামের বাড়ি
সব্যসাচী এই লেখকের বাড়ী কুড়িগ্রাম শহরের  থানাপাড়ায়। তার বাবা মরহুম সিদ্দিক হক একজন হেমিওপ্যাথিক  ডাক্তর ছিলেন। শহরের ঐতিহ্যবাহি জাহাজ মোড়ে তার মায়ের নামে ছিল নুরজাহান মেডিকেল হল। ৫ ভাই তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। ছোট বেলা থেকেই ছিলেন দুরন্ত। তিনি অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত রিভারভিউ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করার পড় ঢাকায় চলে যান। কুড়িগ্রামে তার ছোট ভাই এ্যাডভোকেট আজিজুল হক পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। তার সমবয়সি এখন আর কেউ জীবিত নেই।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য