গ্রামীণ নারীদের কাঁরুকাজ খঁচিত টুপি রপ্তানি হচ্ছে মধ্যপ্রাচেরংপুরের কাউনিয়া উপজেলায় টুপি শিল্পের নীরব বিপ্লব ঘটেছে। এখানকার গৃহিনীদের হাতের তৈরি সুঁই-সুঁতোয় আঁলপনা তোলা কাঁরুকাজ খঁচিত টুপি এখন দেশের চাহিদা মিটিয়ে ওমান, সৌদি আরব, কাতার, জাপানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। এতে করে গ্রামের সহায় সম্বলহীন প্রায় ২৫ হাজার নারী অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হচ্ছেন।অপর দিকে বিড়ি তৈরী স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর ফলে বিড়ি তৈরীতে বিখ্যাত হারাগাছের অনেকেই বিড়ি তৈরী ছেড়ে দিয়ে  এখন টুপি তৈরীতে মনোযোগ দিয়েছেন।

জানা গেছে, গ্রামগঞ্জের নারীরা শুধুমাত্র গৃহস্থালীর কাজ করার পর অবসর সময় শুয়ে বসেই কাটাতেন। অনেকেই সেলাই-ফোঁড়াইয়ের কাজ করলেও সেগুলোতে অর্থ উপার্জনের তেমন সুযোগ ছিল না। তাদের হাতে যখন থেকে টুপিতে নিপুন কারুকাজের সুই-সুঁতার সরঞ্জাম উঠেছে, তখন থেকেই তাদের দিন বদলানো শুরু হয়েছে। এখন তাদের আর শুয়ে-বসে গল্প গুজবে সময় কাটানোর সময় নেই। হাজারো নারী সাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি পরিবারের বাড়তি উপার্জনের জন্য এখন হাতে তুলে নিয়েছেন টুপি তৈরীর কাজ।

সুঁই-সুঁতোয় তারা সারা বছর লাখ লাখ টুপিতে নানা রঙ্গের সুঁতোয় আঁলপনা তুলছেন। আর সেই টুপির সুনাম ছড়িয়ে পড়ছে মধ্যপ্রাচ্যেও সহ বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম  প্রধান দেশে।
কাউনিয়া উপজেলার শাহবাজ, থানাপাড়া, খোপাতি, হলদিবাড়ী, শহীদবাগ, হারাগাছ, রাজিব, গনাই, নিজপাড়া, মাঝিপাড়া, ঢুষমারা, হয়বৎখাঁ, নাজিরদহ, পল্লীমারী, গদাই, পাঞ্জর ভাঙ্গার, গোপীডাঙ্গা, প্রাননাথসহ ৪০টি গ্রামে এখন বছর জুড়ে নারীদের কর্মযজ্ঞ চলছে। কারো কোনো ফুরসত নেই। কখনো দাঁড়িয়ে কখনো বসে সারাদিন ব্যস্ত টুপি তৈরিতে। কথা হয়, উপজেলার সাহাবাজ গ্রামে টুপি তৈরীর কারিগর চার সন্তানের জননী স্বপ্না বেগমের সাথে।

তিনি জানালেন, একখন্ড বসতভিটা ছাড়া অর্থ সম্পদ বলতে কিছুই নেই তাদের। একমাত্র উপার্জক্ষম দিনমজুর স্বামীর আয়ে তাদের ৬ জনের সংসার চলছিল না। সংসারে অভাব-অনটন যেন নিত্যদিনে সঙ্গি। এরপর অভাবের সংসারে সহযোগিতা করতে তিনি কাজ সন্ধান করতে থাকেন। একপর্যায়ে খুঁজে পান টুপিতে হাঁসু ও গুটির সেলাইয়ের কাজ। তিনি জানান, প্রথমদিকে টুপিতে হাঁসু ও গুটির কাজ করতে কষ্ট হলেও এখন আর সমস্যা হয়না। এখন নিপুঁণভাবে এ কাজ শেষ করতে পারছি। পাঁচ বছর ধরে টুপির কাজ করে যা আয় হয় তা দিয়ে আমার সংসার ভালোই চলছে। এখন আমার সংসারে তেমন কোনো অভাব নেই।

তিনি জানান, তার মতো প্রায় ২৫ হাজার নারী এখানে সুই-সুতোয় নিজেদের স্বপ্ন বুনে চলেছেন। আর সেই বুননে থাকছে বাহারি কারুকাজ। এই কারুকাজ খচিত টুপি দেশের চাহিদা মিটিয়ে চলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে। মধ্যপ্রাচ্যের টুপির বাজার জয় করেছে বাংলাদেশের স্বপ্না, আম্বিয়া, ফিরোজা ও জাহানারাদের আঁকা স্বপ্ন। আর টুপিতে এ স্বপ্ন এঁকে দারিদ্রতাকে জয় করেছেন এরা।

অপরদিকে কথা হয় রাজেন্দ্র গ্রামের দিপালী রানীর সাথে। তিনি জানালেন, প্রায় চারবছর আগে সংসারে অভাব-অনটন ছিল তার নিত্যসঙ্গী। সংসারে অভাবের কারণে পরিবারের সবাইকে প্রায় উপাস তাদের থাকতে হতো। এরপর অভাবের সংসারে সহযোগিতার জন্য প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু করি টুপি সেলাইয়ের কাজ। এখন টুপি সেলাইয়ের কাজ করে প্রতিমাসে আয় হচ্ছে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা। তিনি জানান, এনজিও থেকে ঋণ করে বাড়ীতে নতুন ঘর উঠিয়েছি আর টুপি সেলাই করে ঋণের কিস্তি দিচ্ছে।

জানা গেছে, উত্তরের অবহেলিত রংপুরের তিস্তা নদীর তীরবর্তী কাউনিয়া উপজেলার শাহবাজ গ্রামের হাফেজ আবদুল আউয়াল মন্ডল ২০০৩ সালে মাত্র ১৫ জন নারী নিয়ে গড়ে তোলেন এমএমসি নামের টুপির কারখানা। টুপি শিল্পী খাদিজা, জহিদা, শাহাজাদি, সবুরা, কহিনুর, রোজিনা, সালমা, লাভলী, মর্জিনা, পেয়ারী, বিথী সুলতানা, রহমান, হাফিজুর রহমান জানালেন, দিনে তারা ৮-১০টি টুপি সেলাই করতে পারেন। এতে আয় হয় ১৬০ টাকা থেকে ২০০ টাকা। শাহাজাদি, সবুরা, কহিনুর, রোজিনা ও মর্জিনা জানালেন, টুপিতে সুই-সুতা ও ব্লকের কাজ করে ৪ হাজার টাকা বেতন পেলেও শান্তি এটাই, সংসারে দারিদ্রতা পরাজিত করে এখন তারা সংসারে অর্থের জোগান দিতে পারছেন।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য