কুড়িগ্রামে বন্যাদুর্গত এলাকায় তীব্র খাদ্য সংকটকুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার ব্রক্ষপুত্র নদ বিচ্ছিন্ন দুর্গম মশালের চরে গিয়ে দেখা যায় মানুষের সীমাহীন দূর্ভোগ। নদী পথে দেখা হয় এই গ্রামের সাহেরা খাতুন তার দুই মেয়ে আলপনা(১৪) আর আমিনার (১২) সাথে। সকাল থেকে কিছু খায়নি তারা। বহু কষ্টে ভাত রান্না করলেও তরকারির অভাবে ক্ষেতে পারেনি। এক সময় বাধ্য হয়ে লবণ আর মরিচের সন্ধানে দুই মেয়েকে নিয়ে ছোট্ট একটি ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে বাড়ী থেকে বের হয়। তাদের ঘরে এক বুক পানি। প্রতিবেশী বৈজুদ্দির বাড়ী গিয়েছিল মরিচ আর লনণ কর্জ করতে। কিন্ত মেলেনি লনণ ও মরিচ। দু’শত টাকা মরিচের কেজি কেনার সামর্থ নেই। ঘরের এক হাটু পানির মধ্যে পরিবার পরিজন নিয়ে মাচানের উপর এক প্রকার উপোস দিন কাটাচ্ছে। তাদের দিন রাত মিলে এক অথবা দুবেলা খাবার জুটছে।

শুধু সাহেরা খাতুনের পরিবারের এ অবস্থা নয় একই অবস্থা গৃহবধু রাশেদা খাতুন(৩৩) স্বামী শহীদুল ইসলাম (৪২),নবীরণ(২৫), চায়না বেগম (৩৫) সহ অনেকের। বন্যার পানিতে আশপাশের সবজি ক্ষেত দোকান পাঠ সম্পূর্ন পানির নীচে। কারো কারো ঘরে চাল থাকলেও জ¦ালানিীর অভাবে রান্না করতে পারছেন না। ফলে এক বেলা শুকনা খাবার খেয়ে উপোস করতে হচ্ছে। শিশুদের নিয়ে পড়েছে চরম বিপাকে। শিশু খাদ্য কেনার সামর্থ নেই। আর অসুস্থ্য হলে চিকিৎসা কিংবা ঔষধের ব্যবস্থা নেই এখানে। চার দিকে শুধু থৈ থৈ পানি।

বন্যাদুর্গত মানুষের সাথে কথা বলে জানাযায়, এক সপ্তাহের বেশী সময় ধরে বেকার দিন কাটাচ্ছে বন্যা  কবলিত তিন শতাধিক গ্রামের প্রায় দেড় লক্ষ মানুষ। ধার দেনা অথবা চড়া সুদে টাকা নিয়ে কোন রকমে জীবনটাকে বাঁচিয়ে রেখেছে তারা। বিশাল এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে এখনও কোন সরকারী ত্রাণ পৌঁছেনি। বন্যা কবলিত ধরলা, ব্রক্ষপুত্র, দুধকুমোর, তিস্তা সহ ১৬টি নদ-নদীর অববাহিকার ৪শত ৫টি চর-দ্বীপচরের পানি বন্দী অধিকাংশ মানুষ পুরোপুরি দিনমজুরী ও কৃষির উপর নির্ভরশীল। তাদের ঘরে মজুদ খাবার শেষ হবার উপক্রম হয়েছে। জেলার ৯টি উপজেলার ৬৫টি ইউনিয়নের নদ-নদী তীরর্বতী ৪শ চর-দ্বীপচর গ্রাম বন্যার পানিতে পুরো তলিয়ে রয়েছে। চারিদিকে পানি আর পানি। গ্রামীন কাঁচা পাকা সড়কগুলি পানির নীচে তলিয়ে যাওয়ায় গ্রামগুলোর সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিছিন্ন হয়ে পড়েছে। ব্রক্ষপুত্রের প্রবল ¯্রােত বয়ে যাচ্ছে সাহেবের আলগা আর বেগমগঞ্জ ইউনিযনের ১৮টি ওয়ার্ডের সবকটি গ্রাম। এ দুটি ইউনিয়নে প্রায় ৩২ হাজার  মানুষ পানি বন্দী হয়ে পড়েছে। ৬ হাজার পরিবার কর্মহীন হয়ে খাদ্য কষ্টে পড়েছে।

এদের অধিকাংশই দৈনিক আয়ের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। দুঃসহ এক সংকট পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে তারা। একবেলা আধাপেটা খাবার জুটছে। অন্য সময় উপোস। দারুন রকম অপুষ্টির শিকার হয়ে পড়েছে শিশু, কিশোর, বৃদ্ধ ও মহিলারা। ব্রক্ষপুত্র পাড়ের বন্যা কবলিত গ্রাম বালাডোবা, খুদিরকুঠি, পোড়ারচর, মশালেরচর, চরমোহম্মদ, চরফকিরমোহম্মদ, বতুয়াতুলি, আক্কলমামুদ, চিতুলিয়া,  দৈখাওয়া, চেরাগেরআলগা,জাহাজেরআলগা, চরদুগাপুর, সাহেবের আলগা, গেন্দারআলগা, কাজিয়ারচর, সুখেরবাতির চর ঘুরে মানুষের চরম দুর্ভোগ চোখে পড়ে।

বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বেলাল হোসেন জানান, তার ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ড ৭দিন থেকে পানিতে তলিয়ে আছে। প্রায় ১৪হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ। মাত্র ৪ মেঃ টঃ জি আর এর চাল বরাদ্দ পেয়েছেন। যা প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম। এখন বিতরণ করা হয়নি। আতংকে আছি এত অল্প চাল কিভাবে বিতরণ করবো। প্রতিদিন তার কাছে দু থেকে তিনশ মানুষ শুধু খাবারের জন্য আসছেন। এক কথায় খাদ্যের জন্য হা-হা-কার বিরাজ করছে। কিন্তু আমরা নিরুপায়।

জেলা প্রশাসক খান মোঃ নুরুল আমিন জানান, বন্যা ও ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা তৈরীর কাজ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে দু’দফায় ১০ লাখ ৯৪ হাজার টাকা ও ১৯২ মে. টন চাল ববাদ্দ করা হয়েছে। পুরোদমে বিতরণ শুরু হলে এ সংকট থাকবে না। শনিবার ব্রক্ষপুত্র ও ধরলা নদীর পানি ছিল বিপদসীমার উপর। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট সকলের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। সবার সহযোগিতায় সমন্বিত ভাবে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলা করা হচ্ছে।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য