রায়গঞ্জ হাসপাতাল নতুন করে চালুর দাবিতে আন্দোলনের প্রস্তুতিনাগেশ্বরীতে রায়গঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি পুন:সংস্কার করে অবিলম্বে চালু করার জোর দাবি উঠেছে তিন উপজেলার জনসাধারনের। এ হাসপাতাল চালু করা এখন তাদের প্রাণের দাবি। আর এ দাবি বাস্তবায়নে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠন সেবকবন্ধু সংগঠন, উচ্ছ্বাস সাহিত্য সুহৃদ, মায়ের দোয়া বিদ্যাবীথি, সেবক সংঘসহ সকল স্তরের জনসাধারণ। ইতোমধ্যেই  দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত এ আন্দোলন অব্যাহত রাখতে একটি কমিটিও করা হয়েছে।

উল্লেখ্য  কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার  রায়গঞ্জ ইউনিয়নের প্রাণকেন্দ্র অবস্থিত রায়গঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি আজ জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। পোকামাকরের অভয়ারণ্য এই হাসপাতাল চত্বরটি এখন গরু ছাগল চরানোর উপযুক্ত স্থান। যেন দেখার কেউ নেই। শুধু নির্বাচনের সময় এলেই স্থানীয় চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য প্রার্থীরা নিরিহ জনসাধাধারনের প্রতি সান্ত¡নার বানী আর বুকে ভেজা গামছা তুলে দেয়া ছাড়া কোনো কাজ হয়নি। এর উন্নয়ন শুধু বক্তৃতা আর প্রতিশ্রুতির মাঝেই সীমাবদ্ধ। অথচ এই হাসপাতালে দিনে বহু রোগী চিকিতসাসেবা নিয়ে উপকৃত হত। যা এখন আর নেই।

রায়গঞ্জে হাসপাতালটি গড়ে ওঠার প্রেক্ষাপটঃ ১৯৪৭ সাল, দেশ বিভেদের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় তৎকালীন পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের। পাকিস্তান শাষনামলে এবং দেশ বিভেদের প্রায় ১৫ বছর পর হলেও পাকিস্তান সরকারের বোধদ্বয় হয় যে অসহায় বন্যা কবলিত নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী ও ফুলবাড়ি উপজেলার দুস্ত মানুষগুলোর উন্নত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তারই বদৌলতে উল্লেখ্য ৩ উপজেলা নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী ও ফুলবাড়ি এর মধ্যবর্তী স্থান রায়গঞ্জ কে বিবেচনায় নিয়ে ১৯৬২ সালে পাকিস্তান সরকার কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলেন আধুনিক রায়গঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি। তৎসংশ্লিষ্ট সময়ে গড়ে ওঠে রায়গঞ্জ ব্রীজটিও। ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল অবধি হাসপাতালটি সম্পূর্ণরুপে কার্যকর থাকে এবং উল্লেখ্যিত ৩ উপজেলার মানুষ সুচিকিৎসা পাবার দরুন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের পরও স্বস্তির নিশ্বাস নিয়ে প্রশান্তির ঘুমে নিঢল হয়ে পরতেন।

হাসপাতালটির অভ্যন্তরীন কাঠামো বিন্যাসঃ ১৯৬২ সালে ৯.৪৮ একর জমিতে গড়ে ওঠা এই হাসপাতালটি মূলত ১০ শয্যা বিশিষ্ট। এবং দুটি বিভাগে অর্থাৎ অন্তর্বিভাগ এবং বহির্বিভাগে বিভক্ত রেখে দিনের পর দিন উন্নত এবং অক্লান্ত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করে। হাসপাতালটির রয়েছে মোট আটটি ভবন যার মধ্যে একটি দ্বিতল ভবন যা মূলত হাসপাতালের মূল ভবন। ৩ টি ভবন চিকিৎসকদের কোয়ার্টার হিসাবে, ৩ টি ভবন তৃতীয় শেণির কর্মকর্তাদের, এবং ২ টি ভবন দ্বীতিয় ও চতুর্থ শেণির কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত ছিল।

হাসপাতালটির বর্তমান ব্যহাল অবস্থা ও এর পিছনের কারনঃ ১৯৬২ সালে গঠিত হাসপাতালটি অবিচ্ছিন্নভাবে ১৯৯৭ সাল অবধি চিকিৎসা সেবা প্রদান করে। কিন্তু ১৯৯৮ সালে এর অন্তর্বিভাগ বন্ধ করে কেবলমাত্র বহির্বিভাগ খোলা রাখা হয় এবং এহেন অবস্থায় চিকিৎসা সেবায় ভাটার টান পড়ে। এর পিছনের মূলকারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয় ৮০’র দশকে প্রত্যক উপজেলাস্থ জনসাধারনের দোড়গরায় আধুনিক চিকিৎসা সেবা পৌছে দেবার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গঠন আইন। যার ফলশ্রুতিতে ৩১ শয্যা বিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গড়ে ওঠে নাগেশ্বরী উপজেলায়। এবং বৃহৎ এ জনবলকে রায়গঞ্জ হাসপাতাল মূখিতা থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় এবং শুরু হয় রায়গঞ্জ হাসপাতালের শোচনীয় পর্যায়।

মূলভবন রায়গঞ্জ হাসপাতাল টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে চলতে থাকা হাসপাতালটি থেকে ২০০৭ সালে সম্পূর্ণরুপে বিচ্ছিন্ন করা হয় বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং গলা ধাক্কা দিয়ে পতিত করা হয় এক অন্ধ্যকারাচ্ছন্ন অবস্থানে। যার ফলশ্রুতিতে দিনে দুপুরে কিংবা রাতের আধারে হাসপাতাল এরিয়ায় ভিড় বসতে শুরু হয় নেশাগ্রস্থদের এবং জুয়ারির। হাসপাতাল সংলগ্ন স্থানীয় বাসীন্দা মোঃআবুবক্কর(৬০) জানতে চাইলে বলেন, অনেকে হাসপাতালটি আগলে রাখার চেষ্টা করলেও অসৎ চরিত্রের মানুষদের মারন থাবা থেকে রক্ষা পাচ্ছেনা হাসপাতাল এবং এব সরঞ্জামাদি। কেউ কেউ সর্টকাট রাস্তা তৈরি করেছে হাসপাতালের দেয়াল ভাঙ্গার মাধ্যমে আবার দিনে দুপুরে রাতের আধারে চুরি যাচ্ছে হাসপাতালের প্রয়োজনীয় সকল জিনিস পত্র। হাসপাতালের প্রতিটি পরিত্যক্ত ভবনে শেওলা ধরে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে যে তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধসে পড়ছে দিনের পর দিন। চরম অবস্থা বিরাজ করছে মূল ভবনটিরও। ২০১৩ সালে ৯.৪৮ একর জমির মধ্যে মাত্র ৩ একর জমি এক বছরের জন্য লিজ দেওয়া হয় স্থানীয়দের। কিন্তু মেয়াদ বাড়েনি পরবর্তিতে।

সচেতন মানুষদের অবদানঃ স্থানীয় সমাজ সেবক এবং সচেতন মানুষ ঠিক তখন থেকে একাগ্রতার সহিত কাজ করছেন হাসপাতালটি পুনরায় সম্পূর্নরুপে চালু রাখার জন্য, যখন থেকে শুরু হয় হাসপতালটির এই দুর্দশার দিন। কিন্তু বারংবার ব্যর্থতা থেকে ধিক্কার পেয়ে একপ্রকার ছেড়েই দেন হাসপাতালের আশা। আর তাই রায়গঞ্জ ইউনিয়ন এবং পার্শ্ববর্তী ইউনিয়ন আন্ধারীঝাড়, সন্তষপুর ও রামখানার যুব সমাজ স্বেচ্ছাসেবীবি সংগঠন এবং মিডিয়া ও সমাজকর্মীগন নিঃস্বার্থে এগিয়ে আসেন এর উন্নয়ন বাস্তবায়নের জন্য। “দাবি মোদের একটাই রায়গঞ্জ হাসপাতাল ফেরত চাই” স্লোগানে অনেক জটিলতা এবং টানাপোড়ানের মধ্য দিয়ে আহ্বায়ক আনু ইসলামের সভাপতিত্বে সেবকবন্ধু সংগঠনের সভাপতি শেখ জাহিদুল ইসলাম জাহিদ, মায়ের দোয়া বিদ্যাবীথির প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, হাসান আলী সবুজ সেবক সংঘের সভাপতি, খাইরুল ইসলাম এবং বিশিষ্ট সাংবাদিক এম সাইফুর রহমান এবং কিছু সংখ্যক মিডিয়াকর্মীসহ আরো অনেক মান্যগন্য বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গদের নিয়ে ২৪জুন গঠি হয় পুন:সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি। এ কমিটির মাধ্যমেই দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত কঠোর কর্মসুচি গ্রহন করার ইঙ্গিত দিয়েছেন কমিটি।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য