সৈয়দপুরে শহীদ স্বীকৃতি না পাওয়ায় বাড়ির আঙ্গিনায় স্মৃতিসৌধ স্থাপন১৯৭১ সাল। সারাদেশে যুদ্ধ চলছে। প্রতিদিন পাক হারাদার বাহিনী ও তার দোসররা মানব ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে। সারাদেশের ন্যায় সৈয়দপুর ছিল সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। এখানে অনেক মা-বোন, যুবক-বৃদ্ধ প্রাণ দিয়েছেন পাক হানাদার বাহিনী ও বিহারীদের হাতে। বিভিন্ন এলাকা থেকে হানাদার বাহিনী নারী-পুরুষ, যুবক ধরে এনে পালা করা হয় নির্দিষ্ট স্থানে। সেখান থেকে দলবেধে ওই ব্যক্তিদের হাত-চোখ বেঁধে গোলাহাট (যা বর্তমানে বধ্যভূমি নামে পরিচিত) সেখানে গুলি করে হত্যা করা হয়।

যারা ওই হত্যাযজ্ঞ নিজ চোখে দেখেছে তারা আজ অনেকেই বেঁচে নেই। যারা জীবিত রয়েছে তাদের কাছে ওই সময়টা ছিল একটা দু:সহ যন্ত্রণাদায়ক এবং অতীব কষ্টের। একদিকে নিজের জীবন রক্ষা অন্যপাশে পরিবারের সদ্যস্যদের মুখে একমুঠো খাবার তুলে দেয়া এবং তাদের নিরাপদে রাখা। সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শিরা আজও কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তেমনি এক নির্মম ঘটনা ঘটেছে শহরের নতুন বাবুপাড়ায় এক খ্রিষ্টান পরিবারে। ১৯৭১ সালের ১৫ এপ্রিল দুপুর ১২টা। তখন দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলছে।

ওইদিন ২৫ থেকে ৩০ জনের মত বিহারী রাজাকার খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী দ্বিজেন্দ্র নাথ মল্লিক এর বাসায় প্রবেশ করে। প্রথমে তার মেজো ছেলে শহীদ যাকব মল্লিক বয়স ১৩ বছর। তাকে বন্দুকের নলা দিয়ে পেটাতে থাকে। বাড়ির বারান্দায় বসে থাকা ৬০ বছরের বৃদ্ধ মা শহীদ সরোজনি মল্লিক বাধা দিলে তার বুকে পাষন্ড বিহারী রাজাকার বাহিনী বল্লম দিয়ে হানা দেয়। সাথে সাথেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরে মেজো ছেলেকেও জবাই করা হয়। এরপর মা ও ছেলের লাশ টেনে বাড়ির আঙ্গিনার ইদারায় (কুয়ায়) ফেলে দিয়ে মাটি চাপা দেয়া হয়। এ অবস্থায় বড় ছেলে শহীদ আব্রাহাম লিংকন বয়স ১৮ বছর।

বাড়িতে এসে দলবদ্ধ হানাদার রাজাকার বাহিনীকে দেখে পালাতে থাকে। এক পর্যায়ে ফায়ার সার্ভিসের ২য় তলায় উঠে চুপ করে প্রাণ রক্ষার জন্য বসে থাকে। কিন্তু তার পাশেই ছিল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ক্যাম্প। তখন কতিপয় বিহারী হানাদার বাহিনীকে দেখিয়ে দেয় ছাদের উপর মুক্তিবাহিনী রয়েছে। ওই সংবাদ পেয়ে হানাদার বাহিনী শহীদ আব্রাহাম মল্লিককে ধরে সেখানেই গুলি করে তার লাশ পুতে ফেলে। তৃতীয় রিসার্ঢ সায়মন মল্লিক তখন তার বয়স ছিল ৪ বছর। ভাগ্যক্রমে তিনি সেদিন বেঁচে যান।

তার সাথে বেঁচে যান তার চার মেয়ে রেখা রাণী মল্লিক, রেবা রাণী মল্লিক, রেণু রাণী মল্লিক ও সিলভিয়া মল্লিক। দেশ স্বাধীনের পর অনেক চেষ্টা করেও তার স্ত্রী সন্তানের হত্যাকারীদের শাস্তি দিতে পারেননি বাবা। পাননি তাদের শহীদ স্বীকৃতি। তাই শত যন্ত্রণা বুকে চেপে তিনি নিজ বাড়ির আঙ্গিনার কুয়ার কবরের উপর গড়ে তোলেন শহীদ স্মুতিসৌধ। যা আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এরপর ১৯৭৬ সালের ২৫ জানুয়ারি মারা যান দ্বিজেন্দ্র নাথ মল্লিক। মা-বাবা, ভাই হারিয়ে এতিম হয়ে যায় ওই পরিবারটি। তার মেয়ে রেখা রাণী মল্লিক ও রেণু রাণী মল্লিকও পরবর্তীতে মৃত্যুবরণ করেন। বর্তমানে ওই পরিবারে রয়েছে রেবা রাণী মল্লিক, সিলভিয়া মল্লিক ও ভাই রিসার্ঢ সায়মন মল্লিক।

সরকারিভাবে শহীদ স্বীকৃতি না পাওয়ায় প্রতি বছর বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস এবং শহীদ দিবসে ভাই-বোন মিলে বাড়ির আঙ্গিনায় নির্মিত শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানান তাদের মা ও ভাইদের আত্মার শান্তি কামনায়। দেশ স্বাধীনের আজ ৪৫ বছর পেরিয়ে গেলেও শহীদ স্বীকৃতি পাননি ওই পরিবারটি। এগিয়ে আসেনি কেউ একবারও ওই পরিবারে সান্ত্বনা দিতে। বর্তমানে শহীদ স্বীকৃতি না পাওয়ার যন্ত্রণায় ভুগছে পরিবারটি। বর্তমান সরকারের সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা থেকে  তারা বঞ্চিত।

গতকাল সকালে ওই বাড়িতে গিয়ে রিসার্ঢ সায়মন মল্লিকের সাথে কথা হয় বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন সৈয়দপুর উপজেলা শাখার সভাপতি সাংবাদিক ওবায়দুল ইসলামের। ওই পরিবারের অসুস্থ  সন্তান রিসার্ঢ সায়মন মল্লিক কান্না জড়িত কন্ঠে জানান, ১৯৭১ সালের তার মা-ভাইয়ের নির্মম হত্যার ইতিহাস। তিনি জানান আমার মা-ভাই শহীদ হয়েছে। দেশ স্বাধীন হয়েছে আমি অত্যন্ত গর্বিত কিন্তু আজও আমরা শহীদ পরিবারের সন্তান এ স্বীকৃতি পেলাম না। তাই তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন জননেত্রী শেখ হাসিনার সুদৃষ্টি কামনা করেছেন।

বর্তমান সরকার বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার, বিরাঙ্গনা মা-বোনদের স্বীকৃতি, পুনর্বাসন এবং তাদের নাতি-নাতনিদেরও সকল সুবিধা দিয়েছেন। এটা মহানুভবতার কাজ। তাই এখনও অনেক শহীদ পরিবার রয়েছে অথচ তাদের তালিকায় নাম নেই। নেই তাদের সরকারি কোন স^ীকৃতি। এ বিষয়গুলি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে দেখার জন্য তিনি দাবি তুলেছেন দায়িত্বে থাকা মন্ত্রণালয়ের প্রতি।

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য