03_l-Newborn-peacockডিমে তা দিল মুরগি। আর বিশ-পঁচিশ দিনেই ফুটে বেরোল ফিকে হলুদ রঙের ময়ূর ছানা। কচুঝাড়ের গা ঘেঁষে খোড়ো চালের বেঁটে-খাটো আস্তানা। এক কোণে পালক ফুলিয়ে মগ্ন মুরগি বুকের সবটুকু ওম ঢেলে দিচ্ছে।
হুগলির মসপুর এলাকার লাল-কালো পালকের মুরগিটি জানেই না ‘ভাড়াটে-মা’ হয়ে কোন ডিম সে ফুটিয়ে তুলছে। ঘোমটার আড়াল থেকে মাঝবয়সী মহিলা খেই ধরিয়ে দেন, “মায়ের জাত তো, সন্তানের জন্ম দেয়াই কাজ। দেখবেন, ফোটার পরে নিজের ছানাপোনার সঙ্গে ময়ূর ছানাগুলোরও কেমন যতœ নিচ্ছে! ” এ কিন্তু মোটেই কাক আর কোকিলের গল্প নয়। ময়ূরী সাধ করে মুরগিকে ‘সারোগেট মাদার’ ঠাওরায়নি। বরং তার ডিম চুরি করে বদ্ধ ঘরে মুরগির পেটের নিচে দিয়েছে কারবারিরা। ডিম-ফোটা ছানা কোনও দিনই তার মায়ের কাছে ফিরবে না। বিক্রি হয়ে যাবে। হুগলির পোলবা-রাজহাটের বিস্তীর্ণ আমবাগান আর কুন্তি নদীর ধারে নিবিড় সবুজ আবাদি জমিতে কয়েক দশক ধরে নিশ্চুপে বিস্তার ঘটে চলেছে ময়ূর-মহলের। রাজহাটের আটপৌরে উঠোন কিংবা কলতলায় তাদের অনায়াস আনাগোনা। এককালে জমিদার বাড়িতে তাদের দানাপানি দিয়ে পোষা হয়েছিল। জমিদারির ঘর-দুয়ার-পাঁচিল ভেঙে পড়তে কখন তারা আঙিনা ছেড়ে বেরিয়ে যে দিকে দু‘চোখ যায় ছড়িয়ে পড়েছে। বংশবৃদ্ধিও করেছে। রাজহাটে এখন তাদের সংখ্যা প্রায় সাড়ে পাঁচশো। ধরে চালান দিতে পারলেই পকেটে কড়কড়ে নোট। কিন্তু ময়ূর ধরা কি চাট্টিখানি কথা? ডিম ফুটেই ছানা ময়ূরও সাঁইসাঁই ছোটে। তার পর শক্ত ঠোঁটের ঠোক্কর তো আছেই। বরং ময়ূরী যখন ঝোপেঝাড়ে ডিম পেড়ে খাবারের খোঁজে ইতিউতি গিয়েছে, তা চুরি করে নেওয়া যায়। বন দফতরের এক পদস্থ কর্তা বলেন, “অন্য পাখিদের মতো বাসা বেঁধে ডিম পাড়ার পরিপাট্য নেই ময়ূরের। ঝোপঝাড়ই তার পছন্দ। জঙ্গলে ময়ূরের ডিম তাই নষ্টও হয় প্রচুর। ডিম চুরি করাও সহজ।”
ঝোপঝাড়, ঘাস-জঙ্গল থেকে ময়ূরের ডিম কুড়িয়ে মুরগি দিয়ে ফোটানোর কারবারও তাই দিনে-দিনে বেড়েছে। যার চলতি নাম ‘ময়ূর-ফোটানো’। এলাকার কিছু লোকের সঙ্গে এই কারবারে মদত দিচ্ছে কলকাতার একটি চক্রও। অন্তত বন দফতরের এমনই অনুমান। হুগলির অমরপুর, মসপুর, কামদেবপুরের মতো বেশ কিছু গ্রাম কিংবা আশপাশের ইটভাটায় ময়ূর কেনার অছিলায় পা দিলেই ব্যাপারটা মালুম হয়। ডিম হবে নাকি? নিচু স্বরে এক যুবক জানিয়ে দেয়, “সাতশো টাকা পড়বে কিন্তু।” আর মুরগি দিয়ে ফোটানো ময়ূর-ছানা? চারপাশে সন্তর্পণে চোখ বুলিয়ে চাপা স্বরে তার উত্তর, “দর-দাম করবেন না, পুরো দেড় হাজার পড়বে। নম্বর দিয়ে যান, মাল ফুটলেই খবর দেব। কারবারটা রাজহাটের চৌহদ্দিতে থমকে নেই। মসপুরের ইটভাটা ছাড়িয়ে ময়ূরের ডিম কখনও ঢুকে পড়ছে পড়শি জেলা বাঁকুড়ায়। সেখান থেকে সদ্য ফোটা ময়ূর ছানা সটান কলকাতা। কখনও বা জাতীয় সড়ক ধরে আসানসোল হয়ে ঝাড়খণ্ড। বনপাল (বন্যপ্রাণ) কল্যাণ দাস বলেন, “শুধু জাতীয় পাখি নয়, ময়ূর দেশের বিপন্ন প্রাণীদের শিডিউল-১ তালিকাভুক্ত। তাকে নিয়ে ব্যবসা করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। রাজহাটে এ ধরনের একটা ব্যবসায়িক চক্র সক্রিয় বলে খবর পেয়েই স্থানীয় বনাধিকারিকদের সতর্ক করা হয়েছে।” শীত ফুরোতে, মাস কয়েকের বিরতির পরে সেই কারবারিদের ফের পা পড়তে শুরু করেছে রাজহাট, সুগন্ধার আমবাগানে। পাল্টা প্রতিরোধও অবশ্য আছে। নিশুতি রাতে হাতের পাঁচ ব্যাটারির টচের্র আলোটা মোটরশুঁটি খেতে আড়াআড়ি ফেলে মধ্য তিরিশের উপেন কল্লা চেঁচিয়ে ওঠেন, “এই, কে-রে? ” খেতের আড়ালে দুদ্দাড় ছুটে পালায় কেউ। তিনি একা নন। তাঁর পাঁচ ভাই, স্ত্রী এমনকী বছর চারেকের ছোট্ট মেয়েটিও রাজহাটের ময়ূর বাঁচাও কমিটির সদস্য। উপেনের সত্তর পার করা মা-ও বলেন, “ওরা (ময়ূর) তো ঘরের লোক গো, বাঁচাতে হবে না? ”
গেরস্তের প্রায় আত্মীয় হয়ে ওঠা ময়ূরকুলকে রক্ষা করা যে গ্রামবাসীদের কর্তব্য, তা প্রথম বুঝেছিলেন গ্রামের নিমাই জানা। ময়ূর বাঁচাতে তিনিই গড়ে তোলেন ‘প্রকৃতী সংরক্ষণ সমিতি’। নিমাই মারা যাওয়ার পরে এখন সেই দায়িত্ব সামলাচ্ছেন উপেন। গড়েছেন ‘ময়ূর বাঁচাও কমিটি’। নিজের আয় থেকে মাসে প্রায় সাড়ে তিন হাজার টাকার ধান-গম কিনে বাড়ির আশপাশের ময়ূরকুলের খাবারও জোগাচ্ছেন। তিনিই জানান, মাচের্র মাঝামাঝি মিলন হয় এই এলাকার ময়ূরকুলের। এপ্রিলের মাঝামাঝি ঝোপঝাড় খুঁজে ডিম পাড়ে ময়ূরী। অনেক সময়ে মাচের্র মাঝামাঝিও ডিম মেলে। ২২-২৮ দিনে ফোটে ডিম। সেই সময় এসে গিয়েছে। হাতে ন্যাকড়া জড়িয়ে (সরাসরি হাত দিয়ে ধরলে ডিম নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে) কারবারিদের আনাগোনাও শুরু হয়েছে।
বনবাদাড়ে পাল্টা অভিযানের কথা ঘোষণা করে উপেন বলেন, “এই শুরু হল আমাদের রাত-জাগা।”

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য