মা-শিশুর স্বাস্থ্য পরিচর্যায় বোচাগঞ্জ ষ্টাইলঃ মাদার ক্লাব picডেক্স রিপোর্টঃ ২১ বছরের গৃহবধু রুপছানা বেগম। সম্প্রতি গর্ভবতী হয়ে স্বামী মোস্তাফিজুর রহমান ও শ^াশুড়ির পরামর্শে যুক্ত হয়েছেন একটি মাদার ক্লাবে। দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার আটগাঁও ইউনিয়নে এই ক্লাব। নাম আটগাঁও মাদার ক্লাব। রুপছানার বাড়ি আটগাঁও গ্রামেই।

রুপছানা মাদার ক্লাবে সম্পৃক্ত হওয়ার পর গর্ভবতী শিশুর পুষ্টি ও পরিচর্যা, নবজাতকের পুষ্টি ও পরিচর্যা, গর্ভবতী ও নবজাতক এবং মা ও শিশু  স্বাস্থ্যে পরিচর্যার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানতে পেরেছেন এবং নিজেকে একজন সুখি ও স্বাস্থ্যবান মা হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চালাচ্ছেন। রুপছানা বলেন, আমি মা হতে যাচ্ছি, প্রথম সন্তান হতে যাচ্ছে আমার। কিন্তু গর্ভবতী মায়ের স্বাস্থ্য পরিচর্যা কেমন হবে সে সম্পর্কে ধারণা ছিল না। মাদার ক্লাবে স্বামী ও শ^শুরের পরামর্শে সম্পৃক্ত হয়ে এই বিষয়ে জ্ঞ্যান লাভ করেছি। আশা করি আমার বাচ্চা সুস্থ্য হবে। আমিও ভাল থাকব।

রুপছানার মত আরেকজন হলেন বড় সুলতানপুরের গোলাম মোস্তফার স্ত্রী মাসুমা বেগম। শারিরিক প্রতিবন্ধী এই গৃহবধু ২ সন্তানের মা। তিনি নাফানগর মাদারক্লাবের সদস্য। এটাও বোচাগঞ্জ উপজেলার একটি ক্লাব। গর্ভবতী থাকাকালে মাসুমা এই ক্লাবের সদস্য হন। ক্লাবের সদস্য হয়ে গর্ভকালীন শিশু ও মা এবং সন্তান ভূমিষ্টের পর নবজাতক ও প্রসূতি মায়ের স্বাস্থ্য পরিচর্যা সম্পর্কিত বিভিন্ন পরামর্শ ও সেবা গ্রহণ করেন। তার দ্বিতীয় সন্তানের বয়স এখনো এক বছরের কম। পুরো এক বছর না হওয়া পর্যন্ত তিনি এই মাদার ক্লাবে যুক্ত থেকে সেবা গ্রহণ করবেন বলে জানালেন।
মা-শিশুর স্বাস্থ্য পরিচর্যায় বোচাগঞ্জ ষ্টাইলঃ মাদার ক্লাব pic.jpg 2
দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলায় মাদার ক্লাব এক অভিনব স্বাস্থ্য পরিচর্যা কেন্দ্র যেখানে গর্ভবতী মায়েরা ক্লাবের সাথে যুক্ত হয়ে নিজের জন্য এবং তার অনাগত সন্তানের বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা ও পরামর্শ গ্রহণ করে থাকেন। সেবা ও পরামর্শ শিশু জন্মের পর এক বছর পর্যন্ত চলতে থাকে। দিনাজপুরের একটি বেসরকারী সংস্থা সোসাইটি ফর উদ্যোগ এই অভিনব ক্লাবের উদ্যোক্তা। সংস্থাটি দ্যা কর্ড এইড এর অর্থায়নে ও ভার্ক এর সহযোগিতায় ইষ্টাব্লিশ রাইটস টু হেলথ সার্ভিসেস থ্রু এডভোকেসী বা ‘এরশা’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য গর্ভবতী মা ও নবজাতক শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা।

এই লক্ষ্য থেকে সংস্থাটি গত এক বছরে বোচাগঞ্জ উপজেলার ১নং নাফানগর, ২নং ইশানিয়া, ৩নং মুর্শিদহাট ও ৪নং আটগাঁও ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রসূতি মা ও শিশুর পরিচর্যায় একটি করে মাদারক্লাব গঠণ করেছে।

বোচাগঞ্জে মাদার ক্লাবের কার্যক্রম মুরু হয়েছে ২০১৫ সালের ১ জানুয়ারী হতে। প্রতি ওয়ার্ডে ১টি এবং প্রতি ইউনিয়নে ৯টি করে ৪ ইউনিয়নে সর্বমোট মাদার ক্লাব করা হয়েছে ৩৬টি। প্রতিটি ক্লাবে ১৫ হতে ২০ জনকে সদস্য করা হয়েছে। প্রতিটি ক্লাবে যে মায়েরা সন্তান সম্ভবা অথবা যাদের সন্তানের বয়স ১ বছরের নীচে এমন দম্পতি এবং যে সন্তানের বয়স ১ বছরের বেশি কিন্তু ২ বছরের কম তেমন মায়েরা সদস্য রয়েছেন।

আটগাঁও মাদার ক্লাবের সদস্য রুপছানা বেগম বলেন, গর্ভবতী মায়ের স্বাস্থ্য পরিচর্যা সম্পর্কে আমার তেমন ধারণা ছিলনা। মাদার ক্লাবে আসার পর জেনেছি যে, কিভাবে সুস্থ্য-সবল বাচ্চা জন্ম দেয়া যায়, কিভাবে নিরাপদ মাতৃত্ব বজায় রাখা যায়। বাচ্চা জন্ম নেয়ার পর নবজাতকের ওজন নেয়ার প্রয়োজনীতা কি সেইসব বিষয়েও ধারণা লাভ করেছি। এখন আমার মধ্যে বিশ^াস ও আস্থা এসেছে যে, পেটে বাচ্চা থাকা অবস্থায়, বাচ্চা প্রসবকালে এবং বাচ্চা হওয়ার পর আমাদের স্বাস্থ্য বিষয়ে দুঃশ্চিন্তা হওয়ার মত কিছু ঘটবে না।

কয়েকজন সদস্যর কাছ থেকে জানা গেল, মাদার ক্লাবগুলোতে সদস্যদের মধ্যে ফ্লিপচার্ট ও লুডু খেলার মাধ্যমে স্বাস্থ্য সচেতনতার শিক্ষা দেয়া হয়। পুষ্টি খিচুড়ি রান্না ও খিচুড়ির উপকরণের পরিমান শেখানো হয়। গর্ভবতী মহিলাদেরকে মাটির ব্যাংক দেয়া হয় সঞ্চয়ের জন্য। মহিলারা এই ব্যাংকে বিপদকালীন সময়ের জন্য সাধ্যমত অর্থ সঞ্চয় করেন।

সোসাইটি ফর উদ্যোগ এর নির্বাহী পরিচালক উম্মে নেহার বললেন, প্রসবকালীন সময়ে প্রয়োজনীয় অর্থের জন্য কারো কাছে যেন হাত পাততে না হয় সেই লক্ষ্যে মাদার ক্লাবের সদস্যদের সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করতে এই ব্যবস্থা। আমরা তাদেরকে বিনামূল্যে মাটির ব্যাংক তুলে দিচ্ছি এবং তাদেরকে বলছি যে, তোমরা সাধ্যমত সঞ্চয় করো শুধুমাত্র প্রসবকালীন সময়েরর জন্য। প্রসবকালে জটিলতা হতে পারে, অনেক অর্থের প্রয়োজন হতে পারে, তখন কোথায় যাবে তারা? কার কাছে হাত পাতবে? তারচেয়ে আগের থেকেই যদি তারা সতর্ক হয় এবং সঞ্চয় করে তাহলে বিপদে তেমন বেগ পেতে হবে না।
মা-শিশুর স্বাস্থ্য পরিচর্যায় বোচাগঞ্জ ষ্টাইলঃ মাদার ক্লাব
যারা মা হতে যাচ্ছেন এবং যারা সদ্য মা হয়েছেন তেমন মেয়েদের ও তার সন্তানের স্বাস্থ্য পরিচর্যায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে যাচ্ছে মাদার ক্লাব। মায়ের স্বাস্থ্য পরিচর্যায় এ যেন এক নতুন ডাইমেনশন। ৩নং মুর্শিদহাট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোঃ জাফরুল্লাহ বললেন, গ্রাম বাংলায় নারী ও শিশু স্বাস্থ্য রক্ষায় সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়। মাদার ক্লাব সেরকমই একটা ভাল প্রোগ্রাম যা নতুন মায়েদের জন্য কল্যাণকর হয়েছে।

চামেলী সরকার, হুসনে আরা, মায়ারানী, আফরোজা বেগম। এউ চার জন যথাক্রমে ২নং ইশানিয়া ইউনিয়নের পূর্ববশা মাদার ক্লাব, ৩নং মুর্শিদহাট ইউনয়নের আখাপুর মাদার ক্লাব, চাপাতৈর মাদার ক্লাব ও রুহিগাঁও মাদার ক্লাবের সভাপতি। প্রত্যেকে এক-দেড় বছর বয়সী সন্তানের মা। তারা জানালেন, মাদার ক্লাবগুলোর ঘর নাই। কিন্তু কাজ আছে। শুধু গর্ভবতী মা এবং নবজাতক মায়েদের নিয়ে গঠিত এই ক্লাব সদস্যরা বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে স্বাস্থ্য সচেতনতা ও জ্ঞ্যান লাভ করে থাকে এবং করণীয় বুঝতে পারে। কর্মসুচির মধ্যে আছে গর্ভবতী মায়েদের অভ্যর্থনা কর্মসুচি, সাংস্কৃতিক কর্মসুচি, হেলথ ক্যাম্প, উঠোন সভা, লুডু খেলার মাধ্যমে সচেতনতা লাভ করা, ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া ইত্যাদি।

ডাঃ সেলিনা বেগম আটগাঁও ইউনিয়নের একজন কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার। মাদার ক্লাবের সদস্যদের তিনি পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তিনি বললেন, মাদার ক্লাব হওয়ায় আমরা খুশি। আমরা একসাথে সম্ভাব্য অনেক মাকে অল্প সময়ে পরামর্শ দিতে পারছি। এর ফলে মায়েরা দ্রুতই তাদের করণীয় বুঝতে পারছেন।

দিনাজপুরের বোচাগঞ্জে মাদার ক্লাব এখন একটা পরিচিত ক্লাব। এই ক্লাবের বেশির ভাগ সভা হয় সভাপতির বাড়িতে। সব সদস্যরা সেই সভায় অংশ নেন এবং নিজেদেরকে আগামী দিনের সচেতন মা হিসেবে গড়ে তোলেন। স্বামী-শাশুড়ী সবাই মাদার ক্লাবের সদস্য হতে তাদের সন্তান সম্ভবা বৌ’দের উৎসাহ যোগান।
[ads1]
[ads2]

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য