Thakurgaon mapরাণীশংকৈল উপজেলা সদর থেকে মাত্র সিকি মাইল দক্ষিণে পাকা রাস্তা সংলগ্ন খুনিয়া দিঘী মহান মুক্তিযুদ্ধে ঠাকুরগাঁও জেলার সবচেয়ে বড় আকারের বদ্ধভূমি। ৬ একর আয়তনের খুনিয়া দিঘী প্রায় দু’শ বছর আগে স্থানীয় কোন জমিদার খনন করেছিল। জনশ্রুতি আছে এই এলাকার ব্যবসায়ীরা দিঘীর পাশ দিয়ে ব্যবসা করতে রায়গঞ্জে যেতেন। দিঘীর এলাকাটি নির্জন জঙ্গলাকীর্ণ ছিল। এখানে এক ব্যবসায়ীকে খুন করে দিঘীর পাড়ে ফেলে রেখেছিল। তখন থেকে দিঘীর নাম খুনিয়া দিঘী। মহান মুক্তিযুদ্ধে ব্যাপক গণহত্যা ও নিরীহ মানুষের রক্ত পান করে এই দিঘী তার নামের স্বার্থকতা পেয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে এখানে প্রায় কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়। প্রতি বছর ১৬ই ডিসেম্বর ও ২৬শে মার্চ রাত ১২টা ১মিনিটে তোপধ্বনির পর ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয় শহীদদের।

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর আসলেই ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলার হানাদারদের সেই লোমহর্ষক নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের কথা স্মরণ করে শিউরে ওঠে এই উপজেলার মানুষ। বিভিন্ন এলাকা থেকে স্বাধীনতাকামী নিরীহ লোকজনকে ধরে এনে মুক্তিযোদ্ধাদের খবর জানতে ঐতিহাসিক খুনিয়া দিঘীর পাড়ে একটি শিমুল গাছের সাথে হাতের তালুতে লোহার পেরেক গেঁথে ঝুলিয়ে রেখে রাইফেলের বাট ও বেয়োনেট দিয়ে অবর্ণনীয় নির্যাতন চালানোর পর দীঘির পাড়ে দাঁড় করে ব্রাশ ফায়ারে হত্যার হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকাররা লাশ ভাসিয়ে দিত দীঘির পানিতে। সেখানেই লাশগুলো পচে গলে পানির সাথে মিশে যেত। হাজার লাশ আর রক্তে দীঘির পানির রং সব সময়ই থাকতো লাল। খান সেনারা স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় এলাকার যুবতি ও সুন্দরী নারীদের পিতা-মাতা এবং স্বামীর উপস্থিতিতেই ধরে এনে ক্যাম্পে আটকে রেখে চালাতো পাশবিক নির্যাতন। এ কথা শুনলে গা শিউরে ওঠে।

৭১’র মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন হানাদার বাহিনীর নিষ্ঠুরতম নির্যাতনের বর্ণনা করতে গিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল ডিগ্রী কলেজ অধ্যক্ষ তাজুল ইসলাম বলেন, পাকিস্তানী বাহিনী আমার ভাই নজরুল ইসলামকে ধরে এনে এই খুনিয়া দিঘীতেই হত্যা করেছে। তিনি আরো বলেন- ক্যাম্পে আটকে রেখে সুন্দরী নারীদের ওপর বর্বর নির্যাতন চালাত ওরা। জানা যায়, খান সেনারা স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় পীরগঞ্জ, রাণীশংকৈল, হরিপুর উপজেলার কয়েক হাজার লোককে ধরে নিয়ে এসে রাণীশংকৈলের খুনিয়াদীঘি পাড়ের একটি শিমুল গাছের সাথে হাতের তালুতে লোহার পেরেক মেরে ঝুলিয়ে রেখে মুক্তিযোদ্ধাদের খবর জানতে নানা নির্যাতন চালায়।

পরে হত্যা করে লাশ ভাসিয়ে দিত দীঘির পানিতে। ঐ এলাকায় স্থাপিত সেনা ক্যাম্পে নারীর ওপর চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন। এতে অনেকে অন্ত:সত্ত্বা হয়ে পড়েন। দেশ স্বাধীনের পর অনেকের কোলে জন্ম নেয় পিতৃ পরিচয়হীন অনেক সন্তান। যাদের আর পুনর্বাসন করা হয় নি। খুনিয়াদীঘির পাড়ে পাক বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের নীরব স্বাক্ষী সেই শিমুল গাছটি এখন ডালপালা বিস্তার করে বিরাট আকার ধারণ করেছে। শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে ঐ পুকুর পাড়ে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়।

তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার এনামুল হক টেন্ডারের মাধ্যমে আরসিসি পিলার দিয়ে বাউন্ডারী ওয়াল গ্রীল সহ মোট ৯ লক্ষ টাকার কাজ সম্পন্ন করেন। বর্তমান উপজেলা নির্বাহী অফিসার খন্দকার মোঃ নাহিদ হাসান জানান, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে ধরে রাখতে প্রয়োজনে জাতীয় পর্যায়ের স্মৃতি সৌধ তৈরি করা হবে। ঠাকুরগাঁও- ৩ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ইয়াশিন আলী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি হিসেবে খুনিয়া দিঘীর পাড়ে নতুন আঙ্গিকে স্মৃতিসৌধ তৈরির জন্য এই অর্থ বছরেই বরাদ্দ দেয়া হবে।
[ads1]
[ads2]

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য