ডিমলায় পাথর কোয়ারী বন্ধ করে দেওয়ায় শ্রমিক পরিবারের মানবেতর জীবন যমহামান্য হাইকোর্টে নির্দেশে রয়েরিটি জমাদানের মাধ্যমে বৈধভাবে পাথর কোয়ারী অনুমতি মিলোলও উপজেলা প্রশাসন বন্ধ করে দিয়েছে পাথর উত্তোলন। ডিমলা উপজেলার তিস্তা নদীর বন্যা খড়ায় নির্যাতিত অসহায় হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষেরা পরিবার পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে অনাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছে।

অবহেলিত এই দূর্গম এলাকার মানুষ গুলোকে এক সময় মঙ্গা তাদের কুড়ে কুড়ে খেতো। খাদ্যের জন্য কাজের সন্ধানে তাদের ছুটতে হতো নীজ এলাকা ছেড়ে দেশের বিভিন্ন জেলায়। কিন্তু এবারর চিত্র বদলে গেছে ধান এখন আর হাতে কাটতে হয়না, ভ্যান রিকসায় আর মানুষ উঠতে চায়না। দেশে বিভিন্ন অত্যাধুনিক যন্ত্রচালিত মেশিন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকসা, আর শ্যালো মেশিন চালিত অবৈধ নছিমন করিমনের ব্যাপক ব্যবহারের কারনে অবহেলিত এই এলাকার খেটে খাওয়া মানুষ গুলির আর তেমন কোন কাজ না থাকায় উপজেলার প্রায় ১৫ হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে অনাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছে। উপজেলাটির মোট জনসংখ্যা ২ লাখ ৫০ হাজার। এরমধ্যে প্রায় ৪০ হাজারোই শ্রমিক। উপজেলাটি মোট ১০ ইউনিয়নের ৫টি ইউনিয়নই বন্যা কবলিত হিসেবে পরিচিত পূর্বছাতনাই, টেপাখড়িবাড়ী, খগাখড়িবাড়ী, গয়াবাড়ী ও খালিশা চাপানী ইউনিয়ন। ইউনিয়নগুলির বেশির ভাগ এলাকাই সর্বগ্রাসী তিস্তা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। উপজেলার তিস্তা নদীর চরের নদী ভাঙ্গা মানুষগুলি বছরের বেশিরভাগ সময় পাথর উত্তোলন ও নদীর ওইপারে সীমান্ত পেড়িয়ে জীবনের ঝুকিনিয়ে অতিকষ্টে ভারত থেকে কাশ-ছন সংগ্রহ করে তা বিক্রি করে কোন রকমে জীবিকা নির্বাহ করতো।

ডিমলা তিস্তা পারের দূর্গম বালুচর পানি পারি দিয়ে জীবনের সাথে যুদ্ধকরা সংগ্রামী (বর্তমানে বেকার) শ্রমিকদের কয়েকজন জাদ,লিটন,জাহাঙ্গীর,শামিম,রশিদুল,জুয়েল,জসিয়ার,বুলবুল,খালেক,মিলন,কালাম,শুকুর আলী,মিথুন,সালেহা,করিমন,মমেনা,আম্বিয়া,মাজেদা,লুৎফন সফিয়ার রহমান, জাহেদুল ইসলাম ময়না,মাহাতাব আলী, সইদুল ইসলাম শোভা, ইব্রাহীম আলী, বাতাসু মিয়া, অবিতন নেছা, কহিনুর বেগম, হাজেরা বেগম, মনছুরা বেগম, মায়া রানী, খোদেজা বেগম, কুলসুম বেগম সহ অসখ্য নারী পুরুষ শ্রমিকরা কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন,”পাথর তুইলবার না দিলে-কে খায়াইবো আমাগো” উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দেওয়ায় এবার আমাদের পরিবার পরিজন নিয়ে না খেয়ে মরা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবেনা। তারা বলেন, বছরের প্রায় বেশিরভাগ সময়টা পাথর বালু তুলে, নদীর ওইপার থেকে কাশ-ছন সংগ্রহ করে পার করতাম। শ্রমিকরা সকলেই একসাথে বেকার হওয়ায় কাশ-ছনো আর জোটেনা সবার ভাগ্যে। এখন তাদের ঘরে অভাব আর কষ্ট জেন নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দেখা দিয়েছে। নারী শ্রমিক কোহিনুর বলেন, পাথর তুলবার না দিলে! কে খাওয়াইবো আমাগো !

এই চরে ও বাঁধে বর্তমানে বসবাসরত মানুষদের এই চরেই ছিলো বাব দাদার বসতভিটা। গত ৩০ বছর আগে নদী ভাঙ্গনে এই চর বিলিন হয়ে যায়। নিঃস্ব হয় শতশত বিঘা জমির মালিক। নদীগর্ভে বিলীন হয়ে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া মৃত ছয়ফল পরামানিকের ছেলে হারুন(৪০), শয়ন আলীর ছেলে আঃ মান্নানসহ কয়েকজন জানান, বাব দাদার শতশত জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে আজ আমরা নিঃস্ব ভিটেমাটি টুকুও নেই আমাদের। আমরা নদীর বাধে কোনরকম বসতবাড়ী তৈরী করে বসবাস করে আসছি। কয়েক বছর আগে আবার কিছু জমি জেগে উঠলেও তাতে কোন প্রকার চাষাবাদ না হওয়ায় পাথর বালূ তুলে শ্রমিকের কাজ করে কোন রকমে স্ত্রী সন্তাদের নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন তারা। কিন্তু বেশকিছুদিন ধরে পাথর বালূ উত্তোলন একেবারেই বন্ধ করে দেওয়ায় তারা ধারদেণা করে কিছুদিন চল্লেও টাকার অভাবে গত ক’দিন যাবত পরিবার পরিজন নিয়ে না খেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। বৈধভাবে মহামান্য হাইকোর্টের অনুমতি প্রাপ্ত ৩৯ জন পাথর কোয়ারী কারকের মধ্যে মাজেদ পাটোয়ারী ,রফিক উদ্দিন, শামিম হোসেন, জাহাঙ্গীর আলম, সৈয়দ আলী, জেনারুল ইসলাম, দেবাশিষ চন্দ্র রায়সহ অনেকে অভিযোগ করে বলেন, আমরা এলাকার সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে মহামান্য হাইকোর্টের আপীল বিভাগের নির্দেশ ক্রমে সরকারী কর জমাদানের মাধ্যমে নিজস্ব জমি হতে পাথর কোয়ারী করার জন্য লাইসেন্স করেছি।

হটাৎ কাল বৈশাখী ঝড়ের মতো উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ হতে পাথর কোয়ারী বন্ধ করে দেওয়ায়। আমরা মারাত্বক লোকসানের মধ্যে পড়েছি। পাশাপাশি আমাদের পাথর কোয়ারী করে এলাকার বেকার শ্রমিকরা যে আলোর মুখ দেখেছিলো। তারাও আজ বেকার হয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে অর্ধাহারে অনাহারে দিনাতীপাত করছে। তারা আরো অভিযোগ করে বলেন, নিয়ম মাফিক পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুকুলে ব্যাংকের মাধ্যমে ট্রেজারী চালান দিয়ে টাকা জমা দিলেও অথচ পরিবেশ মন্ত্রনালয়, খনিজ সম্পদ মন্ত্রনালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের যৌথ সমিক্ষার পর ৩৯ জনকে পাথর কোয়ারীর লাইসেন্স প্রদান করার পরেও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড় পত্র না মোলায় পাথর কোয়ারী করা সম্ভব হচ্ছেনা। অথচ তিস্তা নদী হতে ভারী মেশিন দিয়ে অবৈধভাবে যারা পাথর উত্তোলন করছে,তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কোন প্রকার ব্যবস্থা না করায় রাতের অন্ধকারে অর্ধশতাধিক বোমারু মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন করে আসছে।

নদীগর্ভে বিলীন হওয়া পূর্বছাতনাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রভাষক আব্দুল লতিফ খান, টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহিন, খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম লিথন, গয়াবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শরিফ ইবনে ফায়সাল মুন বলেন, তাদের ইউনিয়নের অনেক শ্রমিক না খেয়ে মানবেতর জীবন যাপনের কথা স্বীকার করে বলেন, আমার ইউনিয়নের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ সব হারিয়ে হয়েছে নিঃস্ব। এই শ্রমিক শ্রেনীর মানুষগুলি প্রশাসনের পক্ষ হতে পাথর বালু কোয়ারী বন্ধ করে দেওয়ায় একেবারেই বেকার হয়ে পড়েছে। ৫ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান করে দেওয়া আমার একার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই সরকারী উদ্দোগ ছাড়া কেউ না খেয়ে মারা গেলেও আমার কিছু করার নেই। বলেন পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দেওয়ায় তাদের ইউনিয়নে প্রায় ১৫ হাজার নারী পুরুষ শ্রমিক বেকার হয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে।

এব্যাপারে ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করে বেকার শ্রমিকদের কর্মসংস্থান করা সম্ভব নয়। যদি বৈধভাবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে সরকারী অনুমতি সাপেক্ষে পাথর উত্তোলন করা হয় তাতে আমার কোন আপত্তি নেই।
নীলফামারী জেলা প্রশাসক জাকীর হোসেন বলেন, পাথর কোয়ারী বন্ধ করার ক্ষমতা আমার নেই,তাই এ ব্যাপারে আমার পক্ষে কোন প্রকার মতামত দেয়া সম্ভব নয়।
[ads1]
[ads2]

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য