Dhaki-Photoআরিফ উদ্দিন, গাইবান্ধা থেকেঃ ও বউ চাল ভানে রে, ঢেঁকিতে পাড় দিয়া, নতুন নতুন চাল ভানে, হেলিয়া দুলিয়া ও বউ চাল ভানেরে গ্রাম বাংলার কৃষাণীদের কন্ঠে এ রকম গান আর শোনা যায় না। অগ্রহায়ণ ও পৌষ মাসে কৃষকের ধান কাটার সাথে সাথে কৃষাণীদের ঘরে ঘরে ধানের চাল ভানা বা চাল গুড়া করা, আর পিঠা, পুলি, চালের আটার ফিরনি, পায়েশ তৈরির ধুম পড়ে যেত।

এ ছাড়া বিয়ে সাদী, ঈদ, পূজা ও নবান্ন উৎসবে ঢেঁকিতে ধান ভাঙ্গা ও চাল ভানার সময় গ্রাম্য বধুরা সকলে মিলে একে অপরের হাত ধরে নানা রকম গান ও গল্প করে এসব কাজ করত। ফলে চারদিকে হৈ-চৈ পড়ে যেত। কালের বিবর্তনে আজ ঢেঁকির এ সব কর্ম গাঁথা যেন শুধুই এক ঐতিহ্যের স্মৃতি চারণ। আবহমান বাংলার ঐতিহ্যে ঢেঁকি আগের মত আর চোঁখে পড়ে না।

এক সময় ঐতিহ্য বাহী ঢেঁকিই ছিল গ্রাম বাংলার প্রাচীন জনপদের চাল ও চালের গুড়া তৈরির একমাত্র মাধ্যম। শেষ রাত থেকে ভোরের স্তব্ধতা ভেঙ্গে ঢেঁকির শব্দ তখন গ্রামের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত। এখন ঢেঁকির সেই ধুপধাপ মুখরিত শব্দ আর নেই। বর্তমানে আধুনিকতার ছোয়ায় দেশের অন্যান্য এলাকার ন্যায় গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায়ও ঢেঁকির ব্যবহার নেই বললেই চলে। উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেখানে বিদ্যুৎ এখনো পৌঁছেনি এ রকম গ্রাম গুলোতে কিছু ঢেঁকি এখনো টিকে আছে।

এখনো মাঝে মধ্যে গ্রামীন জনপদে ঈদ ও পূজা ছাড়াও বিভিন্ন উৎসবে ধান থেকে আতপ চাল ও পিঠা বানাতে চাল থেকে আটা তৈরি করতে গৃহস্থের ঘরে পুরোনো ঢেঁকির ধুপ ধাপ শব্দ শোনা যায়। কিন্তু তা অতি নগণ্য। ঢেঁকি এক প্রকার শিল্প। এক সময় ঢেঁকি শিল্পের কদর ছিল। তৎকালীন মধ্যবিত্ত ও নিম্বিনত্ত অনেক পরিবারেই ঢেঁকিতে ধান ভেঙ্গে ও চিড়া কুটে নিজেরা আর্থিকভাবে লাভবান হত। সাধারণ গৃস্থের ঘরে এখন আর তেমন তা চোঁখে পড়ে না।

বিজ্ঞান প্রযুক্তির ফলে তেল ও বিদ্যুৎ চালিত ধান ভাঙ্গা ও চাল ভানা কলের কাছে ঢেঁকি দাঁড়াতে পারেনি বলেই বাংলার ঐতিহ্য থেকে ঢেঁকি আজ বিলুপ্তির পথে। এক সময় কবি সাহিত্যিকরা ঢেঁকি নিয়ে অনেক কবিতা রচনা করেছেন। আর গায়ক গেয়েছেন কত না গান। ঢেঁকি ছাটা আউশ চালের পান্তা ভাত খেতে এতই স্বাদ লাগত বর্তমান প্রজন্মকে তা বুঝানো যাবে না। অনেকের মতে, কলের ছাটা চালের চেয়ে ঢেঁকির ছাটা চালে পুষ্টিমান বেশি।

প্রাচীন কাল থেকে ঢেঁকির প্রচলন শুরূ হলেও আধুনিক প্রযুক্তি তথা কালের আগ্রাসনে ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি আজ গ্রাম-বাংলার ঘর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।
[ads1]
[ads2]

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য