Rail Workshop-2মো. জাকির হোসেনঃ জনবল সঙ্কট, অপর্যাপ্ত বাজেট ও লোহা চুরি সিন্ডিকেটের দৌরাত্মের কারণে কাঙ্খিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারছে না দেশের সর্ববৃহৎ সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা। আধুনিকায়নের নামে প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও সেটিও সফলতার মুখ দেখেনি। ফলে নীলফামারীর সৈয়দপুরে স্থাপিত ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটি পূর্বের শ্রী হারিয়ে এখন চলছে অনেকটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।

এ কারখানায় মালবাহী ওয়াগন, যাত্রীবাহী কোচ ও ইঞ্জিন মেরামত ও তৈরির সব রকম সুযোগ থাকা সত্বেও না কারণে তা হচ্ছে না। ফলে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে ওয়াগন ও কোচ। দীর্ঘদিন ধরে কারখানাটি ধীরে ধীরে ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্ত এনিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। এর হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে সরকারের আশু দৃষ্টি কামনা করেছেন এলাকাবাসী।

রেলওয়ে কারখানা সূত্র জানায়, ১৮৭০ সালে ওয়াগন ও বাস্পচালিত ইঞ্জিন মেরামতের জন্য ১১০ একর জমির ওপর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। নির্মাণ সামগ্রী রয়েছে ২০ একর জমির ওপর। কারখানার ভেতরে মিটারগেজ রেললাইন রয়েছে ২৮ দশমিক ৩১ কিলোমিটার ও ব্রডগেজ রেললাইন ১১ দশমিক ২৫ কিলোমিটার। এছাড়া ডুয়েল গেজ রেললাইন রয়েছে ২৭ দশমিক ৮ কিলোমিটার।

কারখানাটির ক্রমভগ্নদশার অন্যতম কারণ হিসেবে রয়েছে জনবল সঙ্কট। কারখানার যান্ত্রিক বিভাগের ২ হাজার ৮৪৭ জনের বিপরীতে রয়েছেন ১ হাজার ১৪৪ জন। বৈদ্যুতিক বিভাগে ৩৩৭ জনের বিপরীতে রয়েছেন ১৭৫ জন। চিকিৎসা বিভাগে ১৫৩ জনের বিপরীতে রয়েছেন ৮৬ জন। পূর্ত বিভাগে ৭৫ জনের বিপরীতে রয়েছেন ৪৬ জন। সরঞ্জাম বিভাগে ৩০৬ জনের বিপরীতে রয়েছেন ৯৪ জন। আরএনবি বিভাগে ১১৩ জনের বিপরীতে ১০১ জন। রেলওয়ে স্কুলের শিক্ষক ২৫ জনের জায়গায় রয়েছেন ১৮ জন। মোট ৩ হাজার ৮৫৬ জনের বিপরীতে রয়েছেন ১ হাজার ৬৬৪ জন।
এদিকে কারখানার বিভিন্ন ভারী যন্ত্রপাতিও দীর্ঘদিনের পুরোনো। ৫০ বছরের বেশি পুরোনো যন্ত্রপাতি রয়েছে ৩৮৩টি। ২০ থেকে ৫০ বছরের পুরোনো রয়েছে ২০৫টি। ২০ বছরের পুরোনো রয়েছে ১৫৪টি। দেশের বৃহৎ এ রেলওয়ে কারখানায় তৈরি হয় রেলের নানা ধরণের খুচরা যন্ত্রাংশ। এসবের মধ্যে রয়েছে ২৩৬ প্রকারের ওয়াগনের যন্ত্রাংশ, ১২৬ প্রকারের ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ ও বিবিধ ২৪৯ প্রকারের যন্ত্রাংশ।

বছরে এ কারখানায় ৩১০টি কোচ ও ২৬৪টি ওয়াগন মেরামত করা সম্ভব। কিন্ত লোকবল সঙ্কট ও কারখানার কর্মকর্তা- কর্মচারিদের লোহা চুরির প্রবনতা অব্যাহত থাকায় সামর্থ অনুযায়ী কোচ ও ওয়াগন মেরমত করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে গত ২০০৯-১০ অর্থবছরে এ কারখানায় মোট ১৮১টি কোচ ৩৯৫টি ওয়াগন, ২০১০-১১ অর্থবছরে ২০৬টি কোচ ও ৪৮৬টি ওয়াগন মেরামত করা হয়েছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে ৩০২টি কোচ ও ৬৩০টি ওয়াগন, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৩০২টি কোচ ও ৬১১টি ওয়াগন মেরামত করা হয়। এছাড়া ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২৬৮টি কোচ ও ৫৪২টি ওয়াগন এবং ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৩১০টি কোচ ও ৬৬০টি ওয়াগন মেরামত করা হয়েছে।

২০০৯ হতে ২০১৫ সাল পর্যন্ত কারখানা থেকে মোট ২ হাজার ১৯৭টি ওয়াগন-ব্রডগেজ কোচ এবং ২ হাজার ৮১৩টি মিটার গেজ কোচ সরবরাহ করা হয়। এক্ষেত্রে সামর্থের চেয়েও বেশি পরিমাণে ওয়াগন মেরামত করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া ২০১৫ সালের ঈদুল ফিতরে ৫৯টি ব্রডগেজ কোচ ও ২৫টি মিটারগেজ কোচ সরবরাহ করা হয় এ কারখানা থেকে। ঈদুল আজহায় ব্রডগেজ কোচ ৪৫টি এবং মিটারগেজ কোচ ২০টি সহ ৬৫টি কোচ সরবরাহ করা হয়।

এদিকে কারখানায় দায়িত্বরত ও সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা লোহা চুরির একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বছরে কোটি কোটি টাকার লোহা কারখানা থেকে চুরি হয়ে যায়। মাঝে-মধ্যে বাইরে কিছু কিছু লোহা আটক করে আইওয়াস দেখানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রী ও রেলের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা কারখানাটি পরিদর্শন করে আধুনিকায়ন করার প্রতিশ্র“তি দেন কিন্ত বাস্তবে সেটি আলোর মুখ দেখেনা।

চাহিদা ও সম্ভাবণা থাকা সত্বেও কাঙ্ঘিত উন্নয়ন হচ্ছে না এ কারখানায়। এর জন্য অবশ্য অপর্যাপ্ত বাজেট অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা জানান, কোনো অর্থবছরেই চাহিদামতো বাজেট পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে প্রাপ্ত অর্থেই কোনোরকমে চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

সূত্র জানায়, গত ২০০৮-০৯ অর্থবছরে কারখানার চাহিদা ছিল ১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা কিন্ত পাওয়া যায় ১৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা। একইভাবে ২০১১-১২ অর্থবছরে ১৯ কোটি টাকার চাহিদার বিপরীতে পাওয়া যায় ১৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২৫ কোটি টাকার বিপরীতে পাওয়া যায় ১৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এছাড়া ২০১৩-১৪ অর্থবছরে চাহিদা ছিল ২৮ কোটি টাকা সেখানে পাওয়া যায় ১৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং ২০১৪-১৫ অর্থবছরে চাহিদা ৩২ কোটি ৮৬ লাখ টাকার স্থলে বরাদ্দ দেওয়া হয় ২২ কোটি ৪২ লাখ টাকা।

এ বিষয়ে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার ওয়ার্কস ম্যানেজার (ডাব্লিউএম) মুহাম্মদ কুদরত-ই-খুদা জানান, জনবল সঙ্কট ও বাজেট ঘাটতির কারণে কারখানা কাঙ্ঘিত উৎপাদনে যেতে পারছে না। তবে এখন কারখানাতে লোহা চুরি নেই বলে তিনি দাবি করেন।

সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক (ডিএস) নূর আহম্মদ হোসেন বলেন, ‘ভাই একটু লেখালেখি করেন যাতে আমাদের দেশে কোচ ও ওয়াগন বেশি বেশি তৈরি হয়। এতে বিদেশ থেকে বেশি অর্থ খরচ করে কোচ ও ওয়াগন আমদানির প্রয়োজন পড়বে না।’ বাজেট অপ্রতুলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিক- কর্মচারিদের ওভারটাইম দেয়া সম্ভব হয়ে উঠেনা। এছাড়া কারখানার নিরাপত্তার জন্য কারখানার প্রধান ফটকসহ সবকটি প্রবেশ ও বহির্গমন পথে ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। ফলে এখন থেকে ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক কারখানার কার্যক্রম প্রত্যক্ষ ও ছবি সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে।
[ads1]
[ads2]

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য