Rangpur Mapরংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলায় স্কুল ও মাদ্্রাসার এমপিও জালিয়াতির মাধ্যমে বেতন কোড পরিবর্তন করে উত্তোলিত বর্ধিত বেতন ফেরত দিয়েছেন আরও ৪৩ জন শিক্ষক। সেই সাথে ওই শিক্ষকগন স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানের প্রধানসহ শিক্ষাভবনে উপস্থিত হয়ে মুচলেকাও দিয়েছেন। এর আগে গত ২৬ সেপ্টেম্বর ২৩টি মাদরাসা ও ২৯টি স্কুলের ৬৬ জন শিক্ষক জালিয়াতীর মাধ্যমে তাদের কোড পরিবর্তন করে উত্তোলিত বর্ধিত বেতন মাউশিতে হাজির হয়ে ফেরত এবং মুচলেকা দেন। গত সেপ্টেম্বরে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে “সক্রীয় এমপিও জালিয়াত চক্র” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর টনক নড়ে মাউশির উর্ধতন কর্মকর্তাদের। চলতি বছরের মে থেকে জুলাই মাসের এমপিও কপি অনুসন্ধান করে বেতন কোড পরিবর্তন পুর্বক বর্ধিত বেতন উত্তোলনের সত্যতা মেলে। তাৎক্ষনিক মাউশি জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পত্র ইস্যু করে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে একদিনের নোটিশে জড়িত শিক্ষকদের ঢাকায় ডেকে পাঠান। সেখানে শিক্ষকরা নির্দিষ্ট ফরম পুরণ পুর্বক তিনজন দালালের নাম উললেখ করে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে বর্ধিত বেতন ফেরত দিয়ে মুচলেকা দেন। নিম্ন মাধ্যমিকসহ আরও প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বেতন কোড পরিবর্তন করে বর্ধিত বেতন নিচ্ছে মর্মে পত্রিকায় আবারও খবর প্রকাশের পর উপজেলা মাধ্যমিক কর্মকর্তার নিকট চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই অবধি জড়িত সন্দেহভাজন প্রতিষ্ঠান সমুহের এমপিও কপি মাউশিতে প্রেরণের নির্দেশ দেয়া হয়। এতেও কেচোঁ খুঁড়তে বোরো বেড়িয়ে আসে।

প্রথম ধাপে ৬৬ জনের পর বিধি বহির্ভুতভাবে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন কোড পরিবর্তন করায় পীরগঞ্জের আরও ৪৩জন শিক্ষকসহ স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা শিক্ষাভবনে শুনানির জন্য হাজির হয়েছিলেন। গত সপ্তাহে ঢাকায় শিক্ষা ভবনে ওই শিক্ষকরা হাজিরা দেয়। জানা গেছে, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) আওতাধীন পীরগঞ্জের বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারী চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত এমপিও কপিতে বিধিবহির্ভুত ভাবে বেতন কোড পরিবর্তন করে। বিষয়টি প্রাথমিক ভাবে তদন্তে সত্য প্রমানিত হওয়ায় মাউশির সহকারি পরিচালক (বিশেষ) মোহছেনা বেগম স্বাক্ষরিত এক পত্রের মাধ্যমে বিধিবহির্ভুত ভাবে উত্তোলিত অতিরিক্ত বেতন ফেরত প্রদানসহ সুস্পষ্ট ব্যাখা চাওয়া হয়। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগে আসা ওই পত্রটিতে উললেখ রয়েছে “বিধিবহির্ভুত ভাবে উত্তোলিত অর্থ ট্রেজারী চালান (কোড নং -১-২৫৩১-০০০০-২৬৭১) এর মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা প্রদান করে চালানের মুল কপি পরিচালক (মাধ্যমিক) এর কক্ষে ব্যক্তিগত শুনানিতে অংশগ্রহন করতে হবে”।

সেইসাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধানদেরকেও ওই শুনানিতে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়। অপরদিকে অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা সুবিধা নিয়ে বিধিবহির্ভুত ভাবে আসা বেতন ছাড় করেছেন। আবার অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রধান কিংবা ম্যানেজিং কমিটি ওই বেতন বেতন আটক রেখেছে। বিধিবহির্ভুত ভাবে আসা বেতন কোডের ব্যাপারে কোন প্রতিষ্ঠান প্রধান সহ সংশ্ষ্টলিরা জানেনা বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুকরা জানান। পীলগঞ্জ উপজেলার একটি দালাল চক্র শিক্ষাভবনে কর্মরত একটি চক্রের সাথে গোপন চুক্তিতে সুকৌশলে বেতন কোড পরিবর্তন করে দিচ্ছে বলে ভুক্তভোগীদের সুত্রে জানা গেছে। পত্রটির সুত্রে জানা গেছে, অধিকাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদ্্রাসায় ১০ কোডের বেতন পরিবর্তন করে ৯ কোডে বেতন অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। গত ১০ নভেম্বর ২৪ জন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ১১ নভেম্বর ১৯ জন মাদ্্রাসার শিক্ষক শিক্ষাভবনে শুনানির জন্য হাজির হয়। উপজেলার মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বিধিবহির্ভুত ভাবে বেতন পরিবর্তন করা শিক্ষকরা হলেন- বারুদহ উচ্চ বিদ্যালয়ের নিরঞ্জন কুমার ঘোষ, সিরাজুল ইসলাম ও বিকাশ চন্দ্র পাল, চাঁন্দের বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের মঞ্জুর হোসেন, চাঁন্দপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের রথীন্দ্র নাথ রায়, জামদানি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নজরুল ইসলাম ও আনোয়ারুল ইসলাম, হলদিবাড়ি নিম্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এনামুল হক, আবুল কালাম আজাম ও রফিকুল ইসলাম, হাতিবান্দা উচ্চ বিদ্যালয়েল নুর মোহাম্মদ মিয়া, গিলাবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের লিপি বেগম ও শাসছুল হুদা প্রিন্স, বালুয়া নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মনু রহমান, কাশিমপুর নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের আব্দুল ওয়াদুুদ ও মুশফিকুর রহমান, লালদীঘি মেলা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের মঞ্জু রানী খাতুন ও নিলুফার ইয়াসমিন, আব্দুল্যাপুর জেডএমভি উচ্চ বিদ্যালয়ের গোলাম মোস্তফা ও নুর আলম প্রধান, খালিশা উচ্চ বিদ্যালয়ের মোসলেম উদ্দিন, পীরগঞ্জ আদর্শ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের হানিফ মিয়া, শানেরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের শাহাদত হোসেন প্রধান, রায়পুর দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের শাহারুল আলম মন্ডল।

মাদ্সারার শিক্ষকরা হলেন- কানঞ্চগাড়ী ছাছমলিয়া দাখিল মাদরাসার এ আর আব্দুস সাত্তার, খয়েরবাড়ি পি. বাজার আল মদিনা দাখিল মাদ্রাসার বাবলু মিয়া, তোফাজ্জাল হোসেন, রুহুল আমিন ও মহসিন আলি, চতরাহাট দাখিল মাদ্সারার উম্মে সালমা বানু, সিদ্দিকুর রহমান, ও মফিদুল ইসলাম, ঘোনা শ্যামপুর এইচএমকেইউ দাখিল মাদ্সারার আব্দুস সালাম মিয়া, মদনখালি কোচারপাড়া দাখিল মাদ্রাসার শাজাহান আলী, খোলাহাটি দাখিল মাদ্্রাসার মোজাহারুল ইসলাম, দুরামিঠিপুর ডিএসডি মাদ্রাসার তৌহিদা আক্তার, পাটগ্রাম মাজার শরিফ দাখিল মাদ্রাসার এমএ ছাত্তার, ছাতুয়া দাখিল মাদ্্রাসার রমজান আলী, আব্দুল কুদ্দুস, আনার কলি ও শাহজাহান আলী, ঝাড়বিশলা এইচইউ সিনিয়র মাদ্্রাসার মাহফুজা খাতুন। এ ব্যপারে উপজেলা মাধ্যমিক কর্মকর্তা মুহাম্মদ মাহতাব হোসেন বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান কিংবা ম্যানেজিং কমিটির অগোচরে বেতন কোড পরিবর্তন করা হয়েছে। উললেখ্য, এর আগে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুহাম্মদ মাহতাব উদ্দিন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, উপরের নিদের্শনা অনুযায়ী মার্চ থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত এমপিও সীট ঢাকায় প্রেরণের পর দ্বিতীয় বারের মতো জড়িত শিক্ষকদের তালিকাসহ ট্রেজারি চালাতে বর্ধিত বেতন ফেরত এবং মাউশিতে স্ব শরিরে হাজিরের নির্দেশনা আসে।

উল্লেখ্য, নিয়ম অনুযায়ী এমপিও ভুক্তির জন্য আগ্রহী শিক্ষককে অন লাইনে জেলা বা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে মাউশি অধিদপ্তরে আবেদন করতে হয়। আবেদনের তথ্য যাচাই বাছাই করে মাউশির কম্পিউটার সেল তাদের এমপি ভুক্তি করে। বিধি অনুযায়ী মাদরাসারসহ মৌলভী ও উচ্চ বিদ্যালয়ের ধর্মীয় শিক্ষক ১০ কোডে বেতন পাবার কথা। অন লাইন জালিয়াতীর মাধ্যমে পীরগঞ্জ উপজেলার সহকারী মৌলভী, ধর্মীয় শিক্ষক এমনকি জুনিয়র শিক্ষকরাও তাদের কোড পরিবর্তন করে নিয়েছেন। অথচ জুনিয়র শিক্ষকদের কোড পরিবর্তনের কোন বিধানই নেই। কোড পরিবর্তন করে নেয়া শিক্ষকদের প্রদানকৃত তথ্য যাচাইয়ে জড়িত ৩ জন দালাল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এরা হচ্ছে হোসেনপুর মদিনাতুল উলুমিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার মাওলানা নুরুল হক, বড় আলমপুর দাখিল মাদ্রাসার সুপার আব্দুল খালেক ও পীরগঞ্জ উপজেলা সদরের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান কসিমন নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাওলানা জাইয়েদুল ইসলাম। এছাড়াও উপজেলার ২২টি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত ৭২ জন অতিরিক্ত শিক্ষক দীর্ঘদিনধরে নিয়মিত বেতন উত্তোলন করছে এবং দীর্ঘ দিন ধরে ধামাচাপা পড়ে ওই নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর নিয়োগ জালিয়াতীর তথ্য।
[ads1]
[ads2]

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য