Gaibanda mapআরিফ উদ্দিন, গাইবান্ধা থেকেঃ শিশু সৌরভ গুলিবিদ্ধের ঘটনায় সুন্দরগঞ্জ আওয়ামীলীগ এখন দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। এরই ফলশ্র“তিতে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বঙ্গবন্ধু ম্যুরাল চত্বরে একই স্থানে লিটন সমর্থক মূল আওয়ামী লীগের প্রধান অংশটি উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা আহমেদের নেতৃত্বে এবং লিটন বিরোধী পৌর মেয়র আব্দুল্যাহ আল মামুন ও সাবেক সভাপতি টিআইএম মকবুল হোসেন প্রামানিকের নেতৃত্বাধীন অপর অংশটি একই ইস্যুতে একই সময়ে সভা আহবান করে। জাতি সংঘ কর্তৃক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চ্যাম্পিয়ন অব দ্যা আর্থ সম্মাননা দেয়ায় শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়ে উভয় গ্র“প রোববার ওই সভা আহবান করায় চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং এতে উপজেলা প্রশাসন বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়ে। এক পর্যায়ে উভয় গ্র“প রোববার সভা অনুষ্ঠানের ব্যাপারে অনড় থাকলে শেষ পর্যন্ত প্রশাসন রোববার সভা স্থলে ১৪৪ ধারা জারি করারও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

এমতাবস্থায় উপজেলা প্রশাসনের তৎপরতায় এই বিরোধকে নিস্পত্তি হয়। যেহেতু লিটন বিরোধী গ্র“পটি সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার উদ্যোগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চ্যাম্পিয়ন অব দ্যা আর্থ সম্মাননার জন্য অভিনন্দন জানানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সে কারণে একপর্যায়ে লিটন সমর্থিত উপজেলা আওয়ামী লীগের মূল গ্রুপটি বিরোধীতা থেকে সরে আসে এবং তারা সোমবার একই স্থানে শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানানোর কর্মসূচীটি পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তবে সুন্দরগঞ্জ পৌরসভা যথারীতি রোববার বঙ্গবন্ধু ম্যুরাল চত্বরে পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচীটি পালন করবে।

তবে এ প্রসঙ্গে সরেজমিনে সুন্দরগঞ্জের আওয়ামী লীগের একনিষ্ট নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সুন্দরগঞ্জের এমপি লিটনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের মধ্যে যে দ্বিধাবিভক্তি পরিলক্ষিত হচ্ছে তার সত্ত্বর নিস্পত্তি না হলে এতে ওই উপজেলায় আওয়ামী লীগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ থেকে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করে লাভবান হবে ওই উপজেলায় ঘাপটি মেরে থাকা স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াত-শিবির চক্রটি। তারা মনে করেন, এমপি লিটনের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

সুতরাং তার বিরুদ্ধে আইনগতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথা প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যথারীতি জানিয়েও দিয়েছেন। এরপর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতি সম্মান জানানোই সকলের উচিত বলে তারা মনে করেন। এমতাবস্থায় এমপি লিটনকে নিয়ে মিথ্যা অপপ্রচার চালানোসহ তাকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করার অপচেষ্টা আওয়ামী লীগের দলছুট নেতারা চালাচ্ছেন তা মূলতঃ স্বাধীনতার স্বপক্ষের আওয়ামী লীগটি ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে তারা উল্লেখ করেন।

উল্লেখ্য, ইতোমধ্যে গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সাংসদ মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন তার গাড়িতে হামলাসহ হত্যার চেষ্টার অভিযোগে সুন্দরগঞ্জ থানায় একটি এজাহার করেছেন। সাংসদ ঢাকায় অবস্থান করার কারণে তার প্রতিনিধি তরিকুল ইসলামকে দিয়ে এজাহারের কপিটি থানায় পৌঁছান। সুন্দরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইসরাইল হোসেন সাংসদের ওই এজাহার পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, তাঁর এজাহারে অভিযোগের বিষয় তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সাংসদ মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের স্বাক্ষরিত এজাহারে উল্লেখ করা হয়, গত ২ অক্টোবর সকাল আনুমানিক পাঁচ টার দিকে তিস্তা নদীর মাছ ক্রয়ের জন্য উপজেলার বামনডাঙ্গা নিজবাড়ি থেকে সাংসদ নিজের জিপ গাড়িটি নিয়ে হরিপুর খেয়াঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পথিমধ্যে আনুমানিক সকাল সাড়ে পাঁচটার দিকে গোপালচরণ ব্র্যাক মোড়ে পৌছালে দুইজন মহিলা হঠাৎ করে সাংসদের গাড়ির সামনে দাড়িয়ে পথরোধ করে। তখন তিনি দেখতে পান আশপাশ থেকে ১৫-২০ জনের সশস্ত্র জামায়াত-শিবির কর্মী বিভিন্ন ধরণের দেশিও অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সাংসদকে মারার উদ্দেশ্যে তার গাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে।

এরমধ্যে একজন একটি ইট দিয়ে সাংসদকে মারার উদ্দেশ্যে গাড়িতে ঢিল ছুড়লে গাড়ির সামনের গ্লাস ভেঙ্গে যায়। তখন সাংসদ গাড়িটি ঘুরে নিয়ে তার লাইসেন্সকৃত পিস্তল দিয়ে ফাঁকা গুলি করে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে বাড়ির ফিরে আসেন। সাংসদ এজাহারে উল্লেখ করেন, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গা পুলিশ ফাঁড়ির ৪ পুলিশ হত্যা মামলাসহ ১৫টি মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আসামি সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের হুরাভায়াখাঁ এলাকার মৃত মকবুল হোসেনের ছেলে মোঃ সাখায়াত হোসেন কাজির নেতৃত্বে এই ঘটনা ঘটে।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, এই সময় একই এলাকার মকবুল হোসেনের ছেলে মোঃ তাজুল ইসলাম ও তার স্ত্রী মোছাঃ শিউলি বেগমসহ অপরিচিত ২০ জন জামায়াত-শিবির কর্মী উল্লেখিত ঘটনা ঘটায়। সাংসদ তার এজাহারে পাঁচজন স্বাক্ষীর নাম উল্লেখসহ আরও সাক্ষী আছে বলেও উল্লেখ করেছেন। সাংসদ লিটন এজাহারে আরও উল্লেখ করেন, ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দেলোয়ার সোসেন সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষনার পর জামায়াত-শিবির কর্মীরা সাংসদ লিটনকে হত্যার উদ্দেশ্যে কয়েকবার আক্রমন করে। তাকে হত্যা করতে না পেরে তার অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নি সংযোগসহ ভাংচুর করে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করে। তার এজাহারের বিলম্বের বিষয়ে তিনি উল্লেখ করেন, তার স্ত্রী অসুস্থ্য থাকায় ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচি থাকায় তিনি ঢাকায় চলে যান। যে কারণে এজাহার করতে বিলম্ব হলো।

শুক্রবার গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সাংসদ মনজুরুল ইসলাম লিটনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, গত ২ অক্টোবর আমার উপর হামলার ঘটনায় আমি গত ৬ অক্টোবর লোক মারফত সুন্দরগঞ্জ থানায় একটি এজাহার পাঠিয়েছি। পুলিশ আমাকে বলেছে, তারা আমার দেওয়া এজাহারের অভিযোগ তদন্ত করে দেখছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গাইবান্ধার-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য মো. মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের ছোঁড়া গুলিতে শুক্রবার ভোরে সৌরভ মিয়া (৯) নামে এক শিশু গুরুতর আহত হয়েছে। আশংকাজনক অবস্থায় সৌরভ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সৌরভ ওই উপজেলার দহবন্দ ইউনিয়নের গোপালচরণ গ্রামের সাজু মিয়ার ছেলে। সে হুড়াভায়া খাঁ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। শিশুটি শুক্রবার ভোর সাড়ে ৫টায় তার এক নিকট আত্মীয়সহ রাস্তায় ব্যায়াম ও হাটাহাটি করছিল। সংসদ সদস্য ও উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন ভোরে তার নিজস্ব গাড়িতে করে বামনডাঙ্গা থেকে সুন্দরগঞ্জ যাচ্ছিলেন।

এসময় তিনি বামনডাঙ্গা-সুন্দরগঞ্জ সড়কে ব্র্যাক মোড়ের পশ্চিম পাশে গোপালচরণ এলাকায় পৌঁছে তার চাচা সাজা মিয়াকে কোন কারণ ছাড়াই জোর পূর্বক তার গাড়িতে উঠাতে চেষ্টা করেন। কিন্তু ওই ব্যক্তি তার অকথ্য গালিগালাজ ও আচরণে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে তার গাড়িতে না উঠে দৌড়ে পালায়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সংসদ সদস্য লিটন তাকে লক্ষ্য করে রিভালবার দিয়ে এলোপাথারি পরপর ৫ রাউন্ড গুলি ছোঁড়েন। এর মধ্যে ২টি গুলি সৌরভের দুই পায়ে গিয়ে লাগে এবং পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তাজুল ইসলাম নামে অপর এক ব্যক্তির পরিধেয় কাপড় ভেদ করে একটি গুলি বেরিয়ে যায়।
[ads1]
[ads2]

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য