মোমিন মেহেদী
বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড’ বাক্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে আসছিলো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের রাজনৈতিক ঐতিহ্যবাহি দল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার সেই স্থান থেকে সরে আসছে। অথচ সর্বকালের সেরা বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার একের পর এক নিয়ে আসছে ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবক বিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচী ও এজেন্ডা। যা বাস্তবায়নে নেমেছে ছাত্রলীগের সাথে সাথে পুলিশ-প্রশাসন-মন্ত্রী-এমপি-আমলা এমনকি সরকার দলীয় শিক্ষকগণও। কিন্তু এভাবে কতদিন? হয়তো তার উত্তর স্বয়ং সরকারেরও জানা নেই। তবুও বাংলাদেশকে ভালোবেসে-স্বাধীনতার পক্ষের রাজনীতি সচেতন নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে বলে যাচ্ছি, এগিয়ে যাচ্ছি সত্যের পক্ষে-ন্যায়ের সাথে। আর এ কারনেই নির্ভিকভাবে উচ্চারণ করছি- শিক্ষাক্ষেত্রে ভ্যাট দিয়ে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদেরকে পে-স্কেল থেকে বঞ্চিত করে; প্রশ্নপত্র ফাঁসের ষড়যন্ত্রকারীদেরকে রক্ষার জন্য মরিয়া হয়ে এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে গ্যাস-বিদ্যুৎ-দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে যারা রাজনীতিকদের উদোরপূর্তি উৎসবে ব্যস্ত; তাদের রাজনীতি কখনোই আলোর মুখ দেখতে পারে না; বরং ঢেকে যাবে ভয়ংকর অন্ধকারে। যে অন্ধকারের রাজনীতির কারনে অতিতেও অসংখ্য রাজনীতিক হারিয়ে গেছে; লাপাত্তা হয়ে গেছে রাজনৈতিক দল আর ক্ষমতার রাম-সাম-জদু। কিন্তু তা না ভেবে বয়ে চলেছে নিজেদের মত করে। এই বয়ে যাওয়ার ধারাবাহিকতায় মেডিকেল ভর্তিচ্ছুদের মিছিলে পুলিশের মারধর এবং আটকের কাহিনী নির্মিত হয়েছে।
বাংলাদেশে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছে কিংবা নামবে তাতে কিছু আসুক বা না যাক। কিন্তু এবার আসছে এবং যাচ্ছে; কেননা, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে তারা আন্দোলনে নেমেছে। সেই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা শাহবাগ এলাকায় মিছিল বের করলে পুলিশ তাদের ওপর চড়াও হয় ও বন্দুকের বাঁট দিয়ে তাদের মারধর করে। একই সাথে মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষা নেয়ার দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। যা শুধু ন্যাক্কারজনকই নয়; ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়ের সূচনা। এর আগে ভ্যঠঁ বিরোধী আন্দোলনে গুলি করা হয়েছিলো; আর এখন শুধু হামলা-ই নয়; গ্রেফতার করে করে ভরে রাখা হচ্ছে অন্ধকার কারাগারে। এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার জন্য নতুন প্রজন্মকে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে আসতে হবে। গড়ে তুলতে হবে অধিকার আদায়ের আন্দোলন। যে আন্দোলনে নতুন প্রজন্ম তাদের ন্যয্য অধিকার ফিরে পাবে; ষড়যন্ত্রকারী-প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে জড়িতরা পাবে নির্মম শাস্তি। এই শাস্তির হাত থেকে যেন মুক্তি না মেলে লোভিচক্রের। যারা সামাণ্য অর্থের জন্য শিক্ষা ধ্বংশ করে দিতে তৈরি হয় প্রতিনিয়ত। তাদেরকে গ্রেফতার না করে বিচার না করে বরং শিক্ষার্থীদের বন্দুকের বাঁট দিয়ে মারধর করছে আমাদের তথাকথিত নিরাপত্তা বাহিনী। যে বাহিনী নিজেদের আখের গোছাতে তৈরি থাকলেও তৈরি থাকে না দেশ ও মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার জন্য এক বিন্দু সহায়তা নিয়ে।

উপরুন্ত টেনেহিঁচড়ে ছাত্রীর পোশাক ছিঁড়ে ফেলার মধ্য দিয়ে প্রমাণ করে রাজনীতিকদের পদলেহনের জন্য নিরন্তর তাদের জিহ্বা। যে কারনে প্রায় সব আন্দোলনকারীকে আটক করে থানায় নিচ্ছে পুলিশ। এক শিক্ষার্থী আক্ষেপের সাথে গণমাধ্যমকে বলেছে যে, জনগনের বা শিক্ষার্থীদের কথা ভুলে গেছে সরকার। তারা এখন নির্মমতার রাস্তায় অঅখের গোছাতে ব্যস্ত। যে কারনে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে নেমে আসছে অন্ধকার। মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষা নেয়ার দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা গতকাল সকাল ১০টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে বিক্ষোভ করেন। পরে তারা মিছিল নিয়ে বেলা ১১টার দিকে শাহবাগ মোড়ের দিকে যান। এ সময় পুলিশ জাদুঘরের সামনের বাধা তুলে দেন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা জাদুঘর পেরিয়ে গেলে পুলিশ তাদের বন্দুকের বাঁট দিয়ে মারধর করে। টেনেহিঁচড়ে এক ছাত্রীর পোশাক ছিঁড়ে ফেলে। এ সময় মিছিল থেকে অসংখ্য শিক্ষার্থী আটক করে নিয়ে যায় পুলিশ। অন্য শিক্ষার্থীরা শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেন। পুলিশ গিয়ে প্রায় সবাইকে তাড়িয়ে থানায় নিয়ে যায়। শাহবাগ থানার ভেতর গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বকর সিদ্দিকের কক্ষে আন্দোলনরত একজন শিক্ষার্থীকে খালি গায়ে ঢোকানো হচ্ছে।

টেনেহিঁচড়ে ও মারধরের কারণে তার পুরো শার্ট ছিঁড়ে গেছে। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের আটক করার কারণ জানতে চাইলে রমনা জোনের ডিসি আবদুল বাতেন নির্লজ্জের মত গণমাধ্যমকে বলেছেন, যান চলাচলে বাধার কারণেই তাদের আটক করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের রাইফেলের বাঁট দিয়ে কেন আঘাত করা হয়েছে ও ছাত্রীর পোশাক কেন ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে বলেই এমনটা হয়েছে। তবে পুলিশ যদি কোনো বাড়াবাড়ি করে থাকে, তাহলে তা খতিয়ে দেখা হবে। অবশ্য শিক্ষার্থীরা বলছেন যে, যখন তারা শাহবাগে বসার চেষ্টা করছিলেন, তখন পুলিশ বাধা সরিয়ে দিয়ে তাদের চলে যেতে বলেন। শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে যখন চলে যাচ্ছিলেন, তখন পুলিশ বিনা উসকানিতে অতর্কিতে এসে তাদের সহপাঠীদের মারধর করে তুলে নিয়ে যায়। এই তুলে নিয়ে যাওয়ার রাস্তা কতদিন উম্মুক্ত থাকবে; তা জানে না বাংলাদেশ-বাংলাদেশের মানুষ-শিক্ষার্থী সমাজ। শুধু এতখানি জানি যে, ১৮ সেপ্টেম্বর দেশজুড়ে একযোগে সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজগুলোতে ভর্তি পরীক্ষা হয়। পরীক্ষার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস হয়ে যায়। দেশের ১০টি জেলায় এ নিয়ে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা প্রশ্ন ফাঁসের সাথে জড়িত বলেও অভিযোগ আসছে বিভিন্ন মহলে। তবে আমি মনে করি, মেডিকেল পরীক্ষা ফাঁসকৃত প্রশ্নে নেয়া হয়েছে এটি দেশবাসীর কাছে পরিষ্কার। সরকার তাদের ব্যর্থতাকে আড়াল করার জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবিকে উপক্ষো করে ভর্তি কার্যক্রম শুরু করেছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা যৌক্তিক দাবি আদায়ে পিছ পা হবে না বলে আমার বিশ্বাস-শিক্ষাধারার বিশ্বাস। সাথে সাথে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবে বলেও দৃঢ়ভাবে প্রত্যয় আমার। অবশ্য ষড়যন্ত্রের ইতিহাস বলে যে, ২০০৬ সালের পর এবার এত বড় মাত্রায় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। যারা দিনে ১৭-১৮ ঘণ্টা পড়াশোনা করে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল, তারা আজ পরাজিত হয়ে গেছে অসৎ লোকের অর্থশক্তির কাছে। তাদের স্বপ্নের সঙ্গে করা হয়েছে প্রতারণা। তাদের স্বপ্ন আর পরিশ্রম বৃথা গেছে। স্বাস্থ্য খাতে চলে আসা এ দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান এবং আমাদের প্রাণের দাবি ফাঁসকৃত প্রশ্নে নেয়া পরীক্ষা বাতিল করে নতুন করে পরীক্ষা নেয়া হোক।
ষড়যন্ত্রের জাল যতই দীর্ঘ হোক না কেন, নতুন প্রজন্ম প্রত্যয়ের সাথে এগিয়ে যেতে যেতে সকল ষড়যন্ত্র ভেদ করবে। এই ষড়যন্ত্রই যে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘাতক, এই ষড়যন্ত্রই যে, শহীদ জিয়াউর রহমানের ঘাতক, এই ষড়যন্ত্রই যে, জামায়াত-শিবির-জঙ্গীদের অভিভাবক তা ভুলে গেলে চলবে না। চলবে না বলতে এক্কেবারেই চলবে না। আর তাই চাই ঘুরে দাড়াক সরকার ও সংশ্লিষ্ট সবাই। পরীক্ষা নেয়া হোক নতুন করে; প্রশ্নপত্র ফাঁস যারা করেছে তাদেরকে গ্রেফতার করা হোক মোবাইল ফোন ও কম্পিউটার পিসি ট্র্যাক করে; সাথে সাথে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের স্বাতন্ত্র বেতন স্কেল-এর ঘোষণা দেয়া; শিক্ষার সকল স্তরে ভ্যাট প্রত্যাহার করা; গ্যাস-বিদ্যুৎ-দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে কমিশন গড়ে তোলা ; দুর্নীতি প্রতিরোধে জনক কন্যা শেখ হাসিনা যেমন নিবেদিত; তেমন নিবেদিত আওয়ামী লীগ-জাসদ-ওয়ার্কার্স-সাম্যবাদী দলসহ সকল দলের নেতাকর্মীদেরকে রাখার লক্ষে দুদকের দাঁত দুদককে ফিরিয়ে দেয়া এখন সময়ের দাবী; দাবী বাংলাদেশের সকল নাগরিকের। তা না হলে এখন যেমন দুর্নীতি বসত গেড়েছে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর চারপাশে; ক’দিন পর মূর্খরা বসত গড়বে বাংলাদেশের সকল স্তরে; অবশ্য শিক্ষার লেবাস লাগানো থাকবে সকলের গায়ে; যা খুবই ভয়ংকর হয়ে আসবে ভবিষ্যতে…

[মোমিন মেহেদী : চেয়ারম্যান, নতুনধারা বাংলাদেশ-এনডিবি]
[ads1]
[ads2]

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য