শ্রমিকআজহারুল আজাদ জুয়েল, দিনাজপুরঃ  পেশা বদল হচ্ছে বাংলাদেশের দলিত জনগোষ্ঠীর। পৈত্রিক পেশায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়া এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সম্ভাবনা না থাকায় দলিত জনগণ নিজেদের পৈতৃক ও সম্প্রদায়গত পেশা ছেড়ে দিয়ে ভিন্ন পেশায় যুক্ত হচ্ছেন।

উত্তম দাস, রতন দাস, স্বপন দাস, শরণ দাস। ৪ ভাই। তাদের পিতা বাংলাদেশ দলিত ঋষি পঞ্চায়েত ফোরাম দিনাজপুর জেলা কমিটির সভাপতি শিউ পূজন দাস। পেশায় যিনি মুচি। জুতা ভাল করা, কালি করা, ছেঁড়া স্যান্ডেল ঠিক-ঠাক করে দেয়ার মধ্য দিয়ে যিনি তার পৈতৃক ও জাতিগত পেশা ধরে রেখেছেন। কিন্তু তার ছেলেরা চলে গেছেন ভিন্ন পেশায়!

বড় ছেলে রতন দাস (৩৬) মুহুরী বা আইনজীবী সহকারী হিসেবে কাজ করছেন দিনাজপুর জেলা জজকোর্টে।

প্রায় ১০ বছর ধরে বিভিন্ন আইনজীবীর সহকবারী হিসেবে কাজ করে নিজের সংসার চালাচ্ছেন। রতনের ছোট উত্তম দাস (৩১) খানসমার জমিদারনগরে থাকেন। সেখানে মটর মেকানিক্স হিসেবে কাজ করে আসছেন প্রায় ১০ বছর ধরে। তার ছোট স্বপন দাস দিনাজপুর জেলা শহরের লুৎফন নেছা টাওয়ারে অবস্থিত একটি কাপড়ের দোকানে ৪-৫ বছর ধরে কাজ করছেন। তার ছোট শরণ দাস (২২)। তিনিও কাজ করছেন একটি কাপড়ের দোকানে, গনেশতলা ফায়ার ব্রিগেডের পাশে। এভাবে সব ছেলেরা এখন ভিন্ন পেশায় থেকে নিজেদের সংসার প্রতিপালন করছে।

শুধু শিউপূজনের ছেলেরা নয়! দিনাজপুর জেলার দলিত জনগোষ্ঠীর সন্তানদের অনেকেই এখন ভিন্ন পেশায় নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। গোলাপবাগ নিবাসী ধর্মেন্দ্র দাস বচ্চনের ছেলে হেমন্ত কুমার দাস লেখাপড়ার পাশাপাশি পানির লাইন সংযোগ ও মেরামতের কাজ করছে ৪-৫বছর ধরে। এতে প্রতি মাসে ৬-৭ হাজার টাকা আয় হয় যা দিয়ে নিজের লেখাপড়ার খরচ চালানোর সাথে সাথে বাবাকেও সাহায্য করতে পারে।

দিনাজপুর জেলা শহরের ক্ষেত্রিপাড়া নিবাসী ভূটন দাসের ছেলে উত্তম দাস (২২) ৮ বছর ধরে একটি ঔষধ কোম্পানীর গোডাউনে কাজ করছে। ভূটনের আরেক ছেলে রতন দাস (২৬) দিনাজপুর বাস টার্মিনাল এলাকায় একটি ওয়েল্ডিং কারখানায় কাজ করছে ৮ বছরে ধরে।

এভাবে দেখা যাচ্ছে দিনাজপুর জেলার রবিদাস ও ঋষি সন্তানরা পৈতৃক পেশার পরিবর্তে ভিন্ন পেশার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। অনেকে লেখাপড়াও করছে। অনেকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ নিয়ে বিউটিপার্লার, গরুপালনসহ আরো বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হচ্ছে।

মাইকেল রবিদাস ২২ বছরের যুবক। শিক্ষিত। প্রশিক্ষণ নিয়েছে পশু চিকিৎসার উপর। তিনি জানালেন, প্রশিক্ষণ নিয়ে তার সম্প্রদায়ের মধ্যে যাদের গরু-ছাগলের সমস্যা হচ্ছে তার চিকিৎসা দিচ্ছেন। মদিনা মসজিদ সংলগ্ন এলাকার বসন্ত কুমার দাস জানালেন, তিনি মোবাইল ট্রনিং নিয়েছেন। মোবাইল মেরামতকে পেশা হিসেবে নিয়ে মাসে ৫/৭ হাজার টাকা আয় করছেন।

দেখা যাচ্ছে যে, দিনাজপুরের দলিতদের মধ্যে শুধু রবি ও ঋষিদাসরাই ভিন্ন পেশায় নিজেদেরকে সম্পৃকম্মত করতে পারছে। কিন্তু এই জেলার ডোম ও হরিজনরা এরকম সুযোগ করতে পারছেনা। আবার ঋষি, রবিদাসরাও যে খুব ভাল কিছু করতে পারছে এমন নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা মেকার, কর্মচারী হিসেবে কাজ করছে যেখানে বেতন কম। যারা শিক্ষিত হচ্ছে তারা শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী চাকুরী পাচ্ছেনা। ফলে তাদের মধ্যে হতাশাও বিরাজ করছে।

শিউপূজন, যিনি ঋষি পঞ্চায়েত ফোরাম দিনাজপুর জেলা কমিটির সভাপতি। বললেন, নিজেদের পেশার দূরাবস্থা দেখে ছেলেদেরকে বলেছিলাম যে, তোমরা অন্য কোন কাজ করো। তারা আমার কথা মেনে অন্য পেশায় গেছে। হয়তো সেখানেও তারা কম অর্থ রোজগার করে। কিন্তু আমাদের পৈতৃক পেশার তুলনায় কিছুটা ভাল আছে এবং সম্মানের সাথে আছে।
[ads1]

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য