এম. কে. দোলন বিশ্বাস
‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি/ নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’ সব জঞ্জাল সরিয়ে শিশুর জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ার এমন আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেছিলেন কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের এ অমিয় কবিতার বাস্তবতা আজ যেনো দূর-বহুদূর। সুকান্ত ভট্টাচার্যের মতো একই আকাক্সক্ষার অনুসরণ যুগে যুগেই প্রাণে প্রাণে হয়েছে। তাই বিধিবিধান প্রণীত হয় শিশু অধিকার নিয়ে, সর্বজনীন ঘোষণা আসে জাতিসংঘের। কিন্তু পৃথিবী শিশুর বাসযোগ্য হলো কই! উল্টো নৃশংসতায় রাজন, রাকিব, সুমাই-রবিউলদের মৃত্যুর সূচকটি ক্রমেই ঊর্ধ্বগামী হচ্ছে। আমাদের প্রাণপ্রিয় সন্তানদের শেষ আর্তনাদ চাপা পড়ছে মানুষরূপী হায়েনাদের উল্লাসে। যার বাস্তবতা আজ ঘরে-বাইরে কোথাও নিরাপদ নয় শিশু।

প্রতিনিয়ত দেশের কোথাও না কোথাও অমানুষিক নির্যাতনের খড়গ নেমে আসছে ফুলের মতো কমল নিষ্পাপ শিশুদের ওপর। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে বেহেস্ত সমতূল্য স্থান বাবা-মায়ের কোলও আজ শিশুদের জন্য মৃত্যুকুপে পরিণত হচ্ছে।
সর্বোপরি বলা যায়, দেশব্যাপী শিশু কিশোরদের বর্বর খুনের অপ্রত্যাশিত উৎসবে মেতে উঠছে মানুষরূপী হায়েনারা। নৃশংসতার কালোথাবায় ঝরছে নিষ্পাপ প্রাণ। শুধু নির্যাতন করেই খান্ত হয়নি ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা। বরং নির্যাতন, নিপীড়নের ভিডিওচিত্রও ছড়িয়ে দিচ্ছে গণমাধ্যমে। কোনো শিশুকে পৈশাচিক কায়দায় খুন করা হচ্ছে। কোনো শিশুকে করা হচ্ছে নির্যাতন।

কাউকে চুরির অপবাদে চোখ উপড়ে ফেলার পর পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ছাদ থেকে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে একদিনের নবজাতককেও। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্যতানকারীরা প্রভাবশালী হওয়ায় স্থানীয় পুলিশও তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়ার নজির সৃষ্টি করেনি। শিশুদের প্রতি এ ধরনের দানবীয় আচরণে স্তব্ধ ক্ষুব্ধ গোটা দেশ।

আমরা বলতে চাই, শিশুদের প্রতি এসব বর্বরতা-নৃশংসতা সামাজিক ও মানবিক বিপর্যয়েরই প্রতিচ্ছবি। মানুষের যখন বিবেক-বুদ্ধি লোপ পায় তখন এমন আচরণ করে আর সমাজে এমন বর্বরতা বাড়তে থাকে। এটা এক ধরনের মানসিক অসুস্থতা, মানবিক মূল্যবোধ লোপ পাওয়া। এর লাগাম টেনে না ধরলে একপর্যায়ে তা মহাবিপর্যয়ে রূপে পরিণত হবে।

শিশু নির্যাতনের খতিয়ান দেখে ভাবতে অবাক লাগে যে, এ কোন নৃশংস সমাজ গ্রাস করছে আমাদের! কোথায় মানুষের মায়া-মমতা, কোথায় মানবিকতা, সহমর্মিতা ফুলের মতো শিশুদের মাড়িয়ে কোন সভ্যতার দিকে যাত্রা আমাদের। অনেক পশুও স্বজাতির ওপর আঘাত হানে না। আমরা কি পশুর চেয়েও অধম হয়ে গেলাম!

সুতরাং কি-বা কারণে আমরা মানুষ থেকে এমন পশু হয়ে উঠছি, আজ সেই হিসাব কষার সময় এসেছে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র কেউই শিশুদের সুরক্ষা দিতে পারছে না, তার কারণ খুঁজতে হবে। শিশু নির্যাতনের প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলছি বলে অনেকেই আবার মসকারা কিংবা একটু বাড়িয়ে অথবা উদ্দেশ্য প্রনোদিতভাবে আমাকে সমাজবিজ্ঞানী ভাবতে পারেন। বাস্তবে আমি কিন্তু সমাজবিজ্ঞানীর আধাফুটাও নয়। তারপরও যতটুকু উপলব্ধি করিছি তা হলো- পারিবারিক অশান্তি, সম্পর্ক-বিচ্ছেদ, পরকীয়া সম্পর্ক, হিরোইজম, ফ্যান্টাসি প্রভৃতি কারণে সৃষ্ট ঘটনাবলির শিকার হচ্ছে শিশুরা। বিশ্বায়নের প্রভাবে ভোগবাদী সংস্কৃতির বিস্তার ঘটছে। ফলে সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সমন্বয় হচ্ছে না। হিন্দি সিনেমা ও সিরিয়ালে নৃশংসতাকে দেখানো হচ্ছে। এতেও প্রভাবিত হচ্ছে অল্পশিক্ষিত সাধারণ মানুষ। প্রভাবিত হচ্ছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। বিশ্বায়নের প্রভাবে ভোগবাদী সংস্কৃতির বিস্তার ঘটছে। শিথিল হয়ে পড়ছে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন। হতাশা, নিঃসঙ্গতা থেকেও মানুষ মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে, লোপ পাচ্ছে তার হিতাহিত জ্ঞান। পত্রপত্রিকায়, টিভি-চলচ্চিত্রে খুন-নৃশংসতার খবর দেখে দেখে মানুষ নিজের অজান্তেই তার মানবিক বোধ খুইয়ে ফেলছে। এ ধরনের অস্বাভাবিক পরিবেশে বেড়ে ওঠাও ক্ষতিকর।

শিশু নির্যাতনের ঘটনা নতুন না হলেও দেশে আশঙ্কাজনকভাবে এর হার বাড়ছে। একই সঙ্গে যেনো পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নির্যাতনকারীদের পৈশাচিকতা। মুক্তিপণ আদায়ের জন্য ‘সহজ টার্গেট’ শিশুদের অহরহ অপহরণ করছে দুর্বৃত্তরা। চলছে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন। এতে রাজি না হলে নৃশংসতার শিকার হচ্ছে তারা। যেমন সমকামিতায় রাজি না হওয়ায় সিলেটে শিশু রাজনকে ‘চোর’ আখ্যা দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। খুলনায় পাইপ দিয়ে কম্প্রেসারের বাতাস পায়ুপথ দিয়ে চালিত করে ও পৈশাচিক নির্যাতনে হত্যা করা হয় শিশু রাকিককে। এদিকে মাতৃগর্ভেও নিরাপদ নয় শিশু। মাগুরায় মায়ের গর্ভেই গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুপথযাত্রী সুরাইয়া। চাঁদপুরে প্রতারণা করতে গিয়ে কবিরাজির নামে বাবা-মা পিটিয়ে হত্যা করেছে শিশুকন্যা সুমাইয়াকে। এমনইভাবে প্রতিনিয়ত দেশের কোথাও না কোথাও উদ্ধার করা হচ্ছে শিশুর লাশ। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব ঘটনা ছাড়াও প্রতিনিয়ত শিশুদের ওপর চলছে বর্বরতা।

অপরাধ বিশ্লেষক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞসহ বিশেষজ্ঞরা একমত হয়েছেন যে, সমাজে যে অবক্ষয় সৃষ্টি হয়েছে তা বোঝা যায় শিশু নির্যাতন, অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা বৃদ্ধিতে। এ ধরনের অপরাধ থেকে শিশুকে নিরাপদ রাখতে হলে সমাজের অবক্ষয় দূর করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন। আজ বলার অপেক্ষা রাখে না যে, নানাবিধ কারণে মানুষের মধ্যে মমত্ববোধ কমে গেছে। শিখিল হয়েছে পারিবারিক বন্ধন। পক্ষান্তরে বেড়েছে অপরাধপ্রবণতা। সমাজে সুশাসনের অনুপস্থিতিও এর অন্যতম কারণ। শিশু নির্যাতন, অপহরণ, ধর্ষণ, এমনকি হত্যার সঙ্গে জড়িতরা পার পেয়ে যাচ্ছে। ফলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) তথ্যমতে, ২০১২ সালে হত্যাকা-ের শিকার হয় ২০৯ জন শিশু; পাঁচজনকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। ২০১৩ সালে হত্যা করা হয় ২১৮ শিশুকে এবং ১৮ শিশুকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। ২০১৪ সালে ৩৫০ শিশু হত্যাকা-ের শিকার হয়; হত্যার চেষ্টা করা হয় ১৩ শিশুকে। আর এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছে ১৯১ শিশুকে; আর ১১ জনকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে।
বিএসএএফ সূত্র জানায়, গত সাত মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২৩০ শিশু; ৬২ শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে; ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৭ শিশুকে। এ সময়ে অপহৃত হয়েছে ১২৭ জন শিশু; অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৩ জন শিশুকে।

বিএসএএফ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালে অপহৃত হয় ১১৮ জন শিশু। এদের মধ্যে ৫০ জনকে হত্যা করা হয়। ৬৬ জন অপহৃত শিশুকে উদ্ধার করা হয়। ২০১৩ সালে ৪২ জন শিশু অপহরণের শিকার হয়। তাদের মধ্যে হত্যা করা হয় ১৩ জনকে। ২০১২ সালে ৬৭ জন শিশু অপহৃত হয়। (তথ্য সূত্র : কালেরকন্ঠ- ০৬.০৮.২০১৫)

শিশু ও মহিলা পরিষদের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, চলতি বছরের ১ মে থেকে ১৪ জুলাই পর্যন্ত তিন মাসে সারাদেশে ১০২৩টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। গত ৩ মাসে হত্যা করা হয়েছে ১৬০ জনকে, যাদের অধিকাংশই শিশু। চলতি বছরের গত ৬ মাসে ৯০টি শিশু অপহৃত হয়েছে। (তথ্য সূত্র : সংবাদ-০৭.০৮.১৫)

গত ৮ জুলাই সিলেটে চুরির অপবাদ দিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালীরা পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে সিলেটের সবজি বিক্রেতা ১৩ বছরের সামিউল আলম রাজনকে। ওই কিশোরকে পেটানোর সময় ভিডিওচিত্র ধারণ করে নির্যাতনকারীরা তা ছড়িয়ে দেয় বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। অভিযোগ উঠে, রাজনহ হত্যার মূল অভিযুক্ত সৌদি আরব প্রবাসী কামরুল ইসলামকে আড়াই লাখ টাকার বিনিময়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে সয়হতা করে স্থানীয় পুলিশ। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় রাজনের শরীরে ৬৪টি আঘাতের চিহ্ন ছিল। গত ১৬ আগস্ট ১৩জনকে অভিযুক্ত করে এ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হয়েছে।

বরগুনায় রবিউল আউয়াল নামে ১১ বছরের এক শিশুকে চোখে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। মাছ চুরির ‘অপবাদে’ স্থানীয় এক ব্যক্তি এই বীভৎস কায়দায় তাকে হত্যা করেছে বলে আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছে। আর মাগুরায় ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় মা ও তাঁর পেটের শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা তো দেশজুড়েই আলোচিত। শিশু নির্যাতন ও হত্যার কটি মামলা আছে, কটি তদন্তাধীন প্রথম আলোর পক্ষ থেকে এ ধরনের তথ্য চাওয়া হলে পুলিশ সদর দপ্তর কম সময়ের মধ্যে তা সরবরাহ করতে পারেনি। তবে চলতি সপ্তাহে আইন কমিশনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নারী ও শিশু-সংক্রান্ত মামলাসহ প্রায় ৩০ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এ সংখ্যাটি প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে।

গত ১ আগস্ট রাতে বরগুনা সদর উপজেলার লেমুয়া গ্রামে পারিবারিক কলহের জেরে দুই শিশু সন্তানকে বিষপান করিয়ে রোজী আক্তার নামের এক গৃহবধূ নিজেও আত্মহত্যা করেন।

গত ২ মার্চ বগুড়ার লতিফপুরে দুই শিশু সন্তানকে হত্যার পর আত্মহত্যার চেষ্টা করেন মা সালমা বেগম। গত ৩১ জুলাই কুমিল্লার মুরাদনগরে গোমতী নদী থেকে ফয়সাল (৭) নামে এক শিশুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। জানা গেছে, পারিবারিক কলহের জেরে বাবা হোসেন মিয়াই তাকে হত্যা করেন।

গত ১২ এপ্রিল রাজধানীর খিলক্ষেত থানার মস্তুল গ্রামে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে গরু চুরির অপবাদে হাত পা বেঁধে পিটিয়ে ও পানিতে ডুবিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় ১৫ বছরের কিশোর নাজিমকে। শুধু পিটিয়ে ও পানিতে ডুবিয়ে হত্যাকারীরা ক্ষান্ত হয়নি। তার সমস্ত শরীরে জলন্ত সিগারেট দিয়ে ছ্যাক দেয়া হয়। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর কিশোরকে বালু নদীতে ফেলে দেয়া হয়। এর কয়েকদিন পর রূপগঞ্জে ভাসমান অবস্থায় নাজিমের লাশ পাওয়া যায়।

১৩ এপ্রিল মৌলভীবাজারের চাঁদনীঘাটে এক মাসের শিশুকে হত্যা করেন বাবা। গত ১৮ জুন টাঙ্গাইলে দেড় বছরের শিশু শাহিনকে হত্যা করে বাবা রনজু মিয়া আত্মহত্যা করেন। গত ৩১ জুলাই কক্সবাজারের চকরিয়ায় দুই শিশু সন্তানকে জবাই করেন বাবা কাশেম। ২৮ জুলাই সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে নবজাতক সন্তানকে হত্যা করেন বাবা ফজলুল হক।

গত বছরের ২৯ নভেম্বর রাজধানীর ভাটারা থেকে সোলমাইদ উচ্চ বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী ফারজানা আক্তার লিজার বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয় ৯ বছরের শিশু লিজাকে। জড়িত সন্দেহে লিজারা যে বাড়িতে ভাড়া থাকত সে বাড়ির মালিকের ছেলে সৌরভকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী আব্দুস সালামকেও গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আরো দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু আট মাসের মধ্যে একে একে সবাই জামিনে ছাড়া পেয়ে যায়। কিছুদিন আগে মামলাটি সিআইডিতে গেছে। (তথ্য সূত্র : কালেরকন্ঠ- ০৬.০৮.১৫)

গত ৩ আগস্ট খুলনার টুটপাড়া এলাকায় পৈচাশিক কায়দায় হত্যা করা হয় দরিদ্র পরিবারের শিশু শ্রমিক রাকিবকে। পায়ুপথে হাওয়া দেয়ার পাইপ ঢুকিয়ে পেটের ভিতরে হাওয়া দিয়ে তীব্র যন্ত্রণায় নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় শিশু রাকিবকে। ঘটনার সময় রাকিব গ্যারেজ মালিক মিন্টুকে বার বার অনুরোধ করলেও সে অনুরোধ তার কানে পৌঁছেনি। শেষ পর্যন্ত তীব্র যন্ত্রণায় মরতে হয় রাকিবকে। মিন্টু মিয়ার গ্যারেজে জীবিকার তাগিদে এক সময় কাজ করত রাকিব। দীর্ঘদিন কাজ করলেও রাকিব তেমন টাকা পয়সা পেতো না। পাশের আরেকটি গ্যারেজে বেতন বেশি পাওয়ার প্রস্তাবে রাকিব চাকরি নেয়। এতে ক্ষুব্ধ মিন্টু মিয়া রাকিবকে তার কাজ ছেড়ে দেয়ায় শাস্তি দেয়ার পরিকল্পনা করে।

গত ২ আগস্ট নাটোরের বড়াইগ্রামে মাছগাও ইউনিয়নের স্থানীয় বুলবুল নামের এক ব্যক্তির বাড়িতে চুরির অপবাদ দিয়ে অষ্টম শ্রেণী পড়ুয়া মাদারাসা ছাত্র সাকিবকে সুপারি গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করা হয়। একই এলাকার আবু সামার নামে আরেক যুবককেও একই কায়দায় নির্যাতন করা হয়। ভয়ঙ্কর এ নির্যাতনের ভিডিওচিত্র ফেসবুকের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। এ ঘটনায় মামলা করেনি পুলিশ। তবে আসামিদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান শুরু করলেও গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।

৩ আগস্ট বরগুনায় দুলাল মৃধার ছেলে রবিউল নামে এক শিশুকে স্থানীয় মাছের গ্যারের মালিক মিরাজ চুরির অপবাদ দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। লোহার রড দিয়ে ওই শিশুর দুটি চোখ উপড়ে ফেলা হয়। শুধু তাই নয় নির্মমভাবে খেজুর গাছের কাটা দিয়ে ওই শিশুকে পিটিয়ে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দেয় মাছের গ্যারের মালিক মিরাজ। পুলিশ এ ঘটনায় মিরাজকে গ্রেফতার করেছে। একই দিন বরগুনার দলুয়া ইউনিয়নের লেমুয়া গ্রামে স্বামীর সঙ্গে বিরোধের জের ধরে নিজের গর্ভে ধারণ করা দুই শিশু কন্যা ৪ বছরের মমি এবং ৩ বছরের তাবেয়াকে বিষ খাইয়ে হত্যা করে মা রোজি। পরে সে নিজেও বিষপানে আত্মহত্যা করে। নিষ্ঠুর এ ঘটনায় গোটা এলাকার মানুষ বাকরুদ্ধ হয়ে যায়।

ময়মনসিংহের ভালুকার মল্লিকবাড়ি ইউনিয়নের মল্লিকবাড়ি গ্রামে ছাগল ছুরির অপবাদ দিয়ে স্থানীয় যুবলীগ নেতা গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে নির্মম নির্যাতন করে শামিম নামে এক কিশোরকে। স্থানীয়রা চেয়ে দেখলেও কেউ এগিয়ে আসেনি। যুবলীগ নেতার নেতৃত্বে স্থানীয় ক্যাডাররা দিনভর ওই কিশোরকে পিটিয়ে আজ্ঞান করে ফেলে। রক্তাক্ত অবস্থায় কিশোরকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

যারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তাদের বেশিরভাগই শ্রমজীবী শিশু। শিশুশ্রম বন্ধ হওয়া উচিত। কিন্তু তারপরও বাধ্য হয়ে অনেক শিশুকে কাজ করতে হচ্ছে। তাই তাদের কাজের সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বাচ্চারা যাদের অধীনে কাজ করছে তাদের আচরণ বদলাতে হবে। ইন্টারনেটের প্রভাবে যোগাযোগ মাধ্যম এখন উন্মুক্ত। এখানে ভালো-খারাপ সব ধরনের তথ্যই মিলছে। খারাপ দিকগুলো আবার বাস্তব জীবনে চর্চা করছেন কেউ কেউ। তাই মূলধারার গণমাধ্যম নৃশংসতার কতটুকু দেখাবে সে বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে বলে মনে করি।

মানুষ বিশ্বায়নের যুগে প্রবেশ করেছে। এ কারণে নগরায়ণ ও প্রযুক্তির উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধ, যা এখন চরম আকার ধারণ করেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা আর দক্ষতার অভাবে সব ক্ষেত্রে অপরাধীরা ধরা পড়ছে না। অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় না আনা গেলে এসব ঘটনা ঘটতেই থাকবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, এসব ঘটনার তেমন একটা বিচার হয় না। নেই আইনের প্রয়োগ। অনেক সময়ই দুর্বল চার্জশিট দেয় পুলিশ। মোদ্দা কথা, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে না পারলে এ ধরনের অপরাধ কমিয়ে আনা যাবে না।

শিশু হত্যা বা নির্যাতন নয়, সামগ্রিকভাবে মানুষের মধ্যে যে অপরাধপ্রবণতা এবং নৃশংসতা বেড়েছে, তা গত ২-৩ বছরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মানুষের মধ্যে এককভাবে বেঁচে থাকার তাগিদে হিংস্রতা বেড়েছে এবং মানবিকতা বোধ লোপ পেয়েছে। সামগ্রিকভাবে মনে হয়, মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে শিশুদের ওপর নিষ্ঠুরতা বেড়েছে। এ থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে মানুষের মধ্যে মমত্ববোধ, পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন আরও সুদূঢ় করতে হবে।

সম্প্রতি নির্যাতন করে শিশুদের হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক তহবিল ইউনিসেফ। গত ৬ আগস্ট সংস্থাটির পক্ষ থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে উদ্বেগের কথা জানানো হয়।এ ধরনের ঘটনা সম্পূর্ণভাবে শিশু অধিকারের নীতিবিরোধী বলে সংস্থাটি বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে, শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো সারা দেশকে নাড়া দিয়েছে। একই সঙ্গে এ ধরনের অপরাধকে জনসম্মুখে তুলে ধরার ক্ষেত্রে দেশের প্রিন্ট, ব্রডকাস্ট এবং সামাজিক মিডিয়ার দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রশংসা করেছে সংস্থাটি।

ইউনিসেফ মনে করে- শিশুদের, বিশেষ করে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আর্থিকভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিশুদের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে সবার সম্মিলিত উদ্যোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিবৃতিতে ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি এডওয়ার্ড বেগবেদার বলেন, ইউনিসেফ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, বাংলাদেশ সরকার এই অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের আইন ও বিচারের আওতায় আনার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই করবে। যাতে এই ধরনের ঘৃণ্য অপরাধের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

এডওয়ার্ড বেগবেদারের মতে, শিশু নির্যাতন, প্রহার এবং হত্যা- এই দেশে নতুন কিছু নয়। কিন্তু শিশু অধিকার বিষয়ে ব্যাপক এবং স্বতঃস্ফূর্ত সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে এই ধরনের ঘটনা সবার নজরে আসছে। ইউনিসেফ বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারি, বেসরকারি সংস্থা এবং সুশীল সমাজের সঙ্গে শিশুদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিতের কাজ করছে।  (তথ্য সূত্র : বাংলাদেশ নিউজ২৪ : ০৬.০৮.১৫)

আমরা বলতে চাই, নির্যাতনকারীরা হচ্ছে প্রভাবশালী। ঘটনা ঘটছে, মামলা হচ্ছে কিন্তু বিচার যে শেষ হচ্ছে, তার কোনো নজির দেখা যাচ্ছে না। ঘটনা ঘটার পর সরকারের পক্ষ থেকে হচ্ছে, দেখছি বা তদন্তাধীন আছে বললে হবে না। পৃথিবীজুড়েই নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। সমাজে এ ধরনের অপরাধ তখনই বেশি ঘটে যখন আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতা সীমাবদ্ধ করা হয় চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে। বর্তমানে আমাদের সমাজে এসব ঘটনা ঘটার পেছনে এসব কারণই দায়ী। আমরা আশা রাখি, আর যাতে কোনো ক্রমেই দীর্ঘ না হয় শিশু হত্যা ও নির্যাতনের খতিয়ান। তৎসঙ্গে বিনাবিচারে পার না পেয়ে যায় শিশু নির্যাতনকারীরা।
[এম. কে. দোলন বিশ্বাস, দৈনিক সংবাদের সাবেক সহ-সম্পাদক]
[ads1]
[ads2]

মন্তব্য লিখুন (ফেসবুকে লগ-ইন থাকতে হবে)

মন্তব্য